সৃষ্টি বার্তা

‘চোখে দেখা যে মৃত্যু আজও কাঁদায়’

মানুষের জীবনে এমন কিছু ঘটনা বা স্মৃতি থাকে যা আমৃত্যু ভোলা যায় না। তেমনি আমার কিশোর জীবনের কিছু ঘটনা সারা জীবনের অমোঘ স্মৃতি হয়ে মানষপটে জ্বলজ্বল করছে।

১৯৭১ সাল। মে মাসের শুরুতেই কুড়িগ্রাম শহর দখলে নেয় পাকহায়েনারা। কুড়িগ্রামের ধরলা নদ দ্বারা বিচ্ছিন্ন উত্তরের নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী থানা তিনটি তখনও মুক্ত। মুক্তিযোদ্ধাদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র । ওই থানা তিনটি মুক্ত রাখতে বাঙ্গালী ই,পি,আর পুলিশ, আনছার ও মুক্তি বাহিনীর নেতৃত্বে¡ মুক্তিযোদ্ধারা ধরলা নদের উত্তরে পাটেশ্বরীতে প্রতিরোধ ঘাটি গড়ে তোলেন।

২৭ শুক্রবার বেলা ১১ট। পাকিস্তান বাহিনীর ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট ক্যাপ্টেন আতাউল্লার নেতৃত্বে পাটেশ্বরী মুক্তিযোদ্ধা ঘাটিতে প্রচন্ড মর্টার সেলের হামলা চালালে মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্প বিধ্বস্থ হয়ে পরে এবং মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে। সেই সুযোগে হানাদার বাহিনী ধরলা নদ পার হয়েই পাটেশ্বরীতে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্থায়ী টেলিফোন বুথের অপারেটরকে জিম্মী করে এবং নাগেশ্বরী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে আরো মুক্তিযোদ্ধা চেয়ে বার্তা পাঠায়।

সেই মিথ্যা বার্তার আলোকে নাগেশ্বরী ‘মুক্তিক্যাম্প’ থেকে প্রথমে একটি পিকাপ ভ্যান ও পরে একটি ট্রাক যোগে মুক্তিযোদ্ধা পাঠানো হয়। পিকাপ ভ্যানটি কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী সড়কের ভাঙ্গামোড় বিলের নিকট পাকহানাদার বাহিনীর এ্যাম্বুসে পরার কয়েক মিনিট আগে স্থানীয় লোকজন হানাদার বাহিনীর ঢুকে পরেছে খবর দিলে মুক্তিযোদ্ধরা দৌড়ে প্রাণে বেঁচে যায়।

আর ট্রাকটি চন্ডিপুরের সটিবাড়ী নামক স্থানে হানাদার বাহিনীর মুখোমুখি এ্যম্বুসে পরায় ট্রাকটিতে থাকা ১৭জন বীর মুক্তিযোদ্ধ ব্র্যাস ফায়ারে শহীদ হন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা হলেন, আব্দুল ওহাব প্রধান,আসাদ আলী, রইচ উদ্দিন, আঃ জব্বার, আবুল কালাম আজাদ, আবুল কাশেম, সেকেন্দার আলী, আব্দুল আলী,এম,আবুল কাশেম,আনছার আলী,আবুল ড্রাইভার,খয়বর আলী, গোলাম রব্বানী,আফজাল হোসেন ড্রাইভার,দেলোয়ার হোসেন.আতিকুর রহমান ও মোজাম্মেল হক। চন্ডিপুরের সে নির্মম হত্যাযজ্ঞ আমি নিজের চোখে দেখেছি।

চন্ডিপুরের সেই স্পট থেকে আমার গ্রামের বাড়ীর দুরত্ব মাত্র ৫‘শ গজ। ‘খানসেনা ধরলা পার হইছে’ খবরটি ছড়িয়ে পরায় বাড়ীর পাশের একটি আমগাছের আড়াল থেকে আমি প্রতিবেশি হাফেজুদ্দিন ও কাশেমসহ দাড়িয়ে রাস্তা উপরে ট্রাকের সেই হত্যাযজ্ঞ প্রত্য করি। ওই সময় আমাদের বাড়ীর পাশের উচু রাস্তায় দাড়িয়ে সহিদ মাষ্টার ও হাপা মিয়া (মৃত) এবং আরো কয়েকজন চিৎকার করে ট্রাকটি ফেরানোর চেষ্টা করেন । কিন্তু সেই চিৎকার মুক্তিযোদ্ধারা শুনতে পান নাই।

শুনলে হয়ত ১৭টি প্রাণ বেঁচে যেত। ওই হত্যাযজ্ঞ দেখার পর আমরা ও গ্রামের লোকজন প্রানের ভয়ে শুন্যহাতে বাড়ীঘড় ছেড়ে ৫কিলোমিটার দুরে কালিগঞ্জের ঝাকুয়াবাড়ী গ্রামের এক দুর সর্ম্পকের মামার বাড়ীতে হাফেজুদ্দিনের পরিবারসহ আশ্রয় নেই। আমি তখন ১৩ বছরের কিশোর। ভিতরবন্দ জেডি একাডেমীতে ৬ষ্ট শ্রেনীতে পড়ি। তাড়াহুড়া করে পালিয়ে যাওয়ায় কাসের বই নেয়া হয়নি।

৭/৮ দিন পর হাফেজুদ্দিনসহ বুদ্ধি করলাম বাড়ী গিয়ে বই আনব। হাফেজুদ্দিন ভাই আমার চেয়ে ৪/৫ বছরের বয়সে বড়। যা কথা সেই কাজ। দু‘জনে ১১টার দিকে পায়ে হেটে বাড়ীতে আসলাম। এসে দেখি ময়লা আবর্জনায় বাড়ী ভরে গেছে। এর পর আমরা দু‘জনে পাকা রাস্তা সাথেই রনজিৎ চন্দ্র মামার বাড়ীর ওঠনে গিয়ে দেখি বাড়ীর কোন অস্থিত্ব নেই ছাইয়ে স্তপ পরে আছে।

ওখানে দাড়িয়ে থাকতেই হানাদার বাহিনীর একটি জিপগাড়ীতে ৪ জন সৈনিক সামনে পিছনে মেশিনগান তাক করে কুড়িগ্রাম থেকে নাগেশ্বরী যাচ্ছে। আমি জিপ গাড়ীর শব্দ ও খানসেনাদের দেখে দৌড়াবার চেষ্টা করলাম, কিন্তু হাফেজুদ্দিন আমাকে টেনে ধরে বল্ল ‘দৌড়াস না গুলি করবে’। আমরা দু‘জন বাড়ীর উঠান থেকে যেতে শুরু করলাম। জিপগাড়ীটি পিছনে এসে থামিয়ে বল্ল ‘এই দাড়াও’। আমরা দাড়ালাম এবং হাউমাউ করে দু‘জনে কান্না শুরু করলাম। জিপের সামনের ছিটে বসা একজন (সম্ভবত অফিসার) এক সৈনিককে ইশারা করায় সৈন্যটি জিপ থেকে নেমে হাফেজুদ্দিনের হাত ধরে তার কাছে নিয়ে গেল।

ছিটে বসা লোকটি হাফিজুদ্দিনের ফর্সা ও নাদুসনুদুস গালে কয়েকবার হাত বুলিয়ে জিপে বসার কথা বলতেই ও মা ও বাবা বাচাঁও চিৎকার দিয়ে হাফেজুদ্দিন মাটিতে শুয়িয়ে পরলো। সেই লোকটি গাড়ী থেকে নেমে হাফেজুদ্দিনকে তুলে দু‘গালে কয়েকবার চুমো খেয়ে বল্ল যাও। আমরা প্রানপণ দৌড়ে ওখান থেকে জীবন নিয়ে চলে আসি। কিশোর বয়সের সেই মর্মান্তিক স্মৃতি-কান্না প্রতিনিয়ত আমার ভেতরে এক ধরনের অব্যাক্ত প্রতিবাদের জন্ম দিয়েই চলছিল। ফলে সিন্ধান্ত নিলাম মুক্তিযুদ্ধে যাবো।

২৫ জুলাই তারিখে বাড়ীতে কাউকে কিছু না বলে আমি ১৬০টাকা ও একটা ব্যাগে জামা কাপড় নিয়ে খাইরুজ্জামান মামা ও গোপালের খামার গ্রামের মেহের মেম্বারসহ রামখানা সীমান্ত দিয়ে ভারতের সাহেবগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধাদের যুবশিবি ক্যাম্পে ভর্তি হই। সেই যুবশিবিরে মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলী চাচার সঙ্গে আমার দেখা হয়। তার গায়ে একটা ছিড়া সার্ট ছিল । সেও পালিয়ে গেছেন। পরে আমার একটা সার্ট তাকে দেই। পরে কর্তৃপ সাহেবগঞ্জ যুবশিবির থেকে আমাদেরকে কোচবিহার শহরের নিয়ে যায় এবং একটি গোডাউন ঘড়ে রাখে। তিনদিন পর সেখান থেকে আমাদেরকে টাপুরহাট “ইউথ ক্যাম্প” নিয়ে যায়।

ভারতের তোর্ষানদীর তীরে টাপুরহাট ট্রেনিং ক্যাম্পে গিয়ে দেখি আমার গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা (বর্তমান ভিতরবন্দ ইউনিয়ন কমান্ডার) নাজিম উদ্দিন, আব্দুল মালেক, আশরাফ আলী, আব্দুস ছোবান, আজিজার রহমান, হাসান আলী, হোসেন আলীসহ আরো কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়। তারা আগেই সেখানে গিয়ে ট্রেনিং নিচ্ছিলেন। তারা আমাকে দেখে আবেগে জড়িয়ে ধরেন এবং বাড়ী ও এলাকার খবর জানতে চান। আমি তাদের বাড়ী ও এলাকায় পাক হায়েনাদের বর্বতার খবর জ্নাাই।

পরে তারা আমাকে ইউথ ক্যাম্পের মেডিকেল ইনচার্জ ডাঃ মজিবর রহমান স্যার ও ক্যাম্প ইনচার্জ রংপুর মাহিগঞ্জের পেয়ারা স্যার এর কাছে নিয়ে যায়। বয়স কম হেতু আমাকে মেডিকেল টিমের অন্তুর্ভক্ত করা হয়। কয়েকদিন পর আমার গ্রামের সবাইকে হায়ার ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানো হয়। আমাকে টাপুরহাট ক্যাম্পই রাখা হয়। টাপুরহাট ক্যাম্পের আশপাশে একপ্রকার ছোট জাতের সাপ কিলবিল করতো। আমরা ভয় পেতাম না।

অক্টোবর মাসে একটি মেডিকেল টিম গিদালদহ হয়ে লালমনিরহাটের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়। আমরা কমান্ডার আজাদ ভাইয়ের দলের অন্তুভুক্ত হয়ে লালমনিরহাট এলাকায় যাই । মোগলহাটে ভয়াবহ যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আমি যে ব্যাঙকারে ছিলাম তার পাশের ব্যাঙকারে কুমিল্লার মজিদ ভাইসহ ৪জন মর্টার সেলের আঘাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে।

এ দৃশ্য চোখে দেখে আমি প্রচন্ড ভয় পাই এবং সেখান থেকে পুনারয় টাপুরহাট ক্যাম্পে ফিরে যাই। টাপুরহাট ক্যাম্পে তিনদিন থাকার পর বাবা মা ভাই বোনের কথা প্রচন্ডভাবে মনে পরায় বাড়ীর উদ্দেশে রওনা দেই। ভাগ্যক্রমে রামখানা সীমান্তে ভারতের চৌধুরীহাট বাজারে খায়রুজ্জানের সঙ্গে পুনরায় দেখা হয়। সেও মুক্তিযোদ্ধাদের কেন্দ্রে থেকে পালিয়ে এসেছে। পরে আমরা দু‘জনেই বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা হই। সন্ধার পরেই বাড়ীতে পৌছিলে মা ও দাদী আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পরেন।

বড় চাচা সোলেমান আলী ব্যাপারী (মৃত.) আমাকে বলে ‘তুই বাড়ীতে থাকিস না’। তোকে খানসেনা পাইলে মেরে ফেলবে। তুই নাকি মুক্তিযুদ্ধে গেছিস’। এর পর ১৪ নভেম্বর ভূরুঙ্গামারী হানাদার মুক্ত হয় এবং ব্যাঙকারে নিহত ক্যাপ্টেন আতাউল্লার মৃতদেহ পাওয়া যায়। পাক হায়েনারা রায়গঞ্জে শক্ত ঘাটি গেড়ে বসে। রায়গঞ্জ দখলে নিতে ১৯ নভেম্বর মধ্যরাতে মুক্তিবাহিনীর ৬নং সেক্টরের লে. আবু মঈন মোহাম্মদ আশফাকুস সামাদ ও ভারতীয় রাজপুত ব্যাটালিয়নের মেজর অপেল যৌথ অভিযান পরিচালনা করেন। এতে আক্রমন ও প্রতি আক্রমনের তীব্রতায় লেঃ আশফাকুস সামাদ ও মেজর অপেল ঘটনাস্থলে শহীদ হন।

পরদিন লে, আশফাকুস সামাদের মৃতদেহ উদ্ধার করে ভূরুঙ্গামারীর জয়মনিরহাট মসজিদের সামনে যথাযোগ্য মর্যাদায় সহযোদ্ধা শহীদ আলীহোসেন, নূর মোহাম্মদ এবং আব্দুল আজিজকে পাশাপাশি সমাহিত করা হয়।

২০ নভেম্বর রায়গঞ্জ পতন ঘটলে পাক-হানাদার বাহিনী দঃ ব্যাপারীহাটে ঘাটিগেড়ে বসে এবং ২৮নভেম্বর গভীর রাতে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনীর সাথে রাতভর রক্তয়ী সম্মুখ যুদ্ধে পাকদানাদার, মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্র বাহিনীর বহু সৈনিক হতাহত হয়। ২৯ নভেম্বর পাক হায়েনারা দঃ ব্যাপারীরহাট থেকে পালিয়ে কুড়িগ্রাম মহকুমা আর্মি হেডকোয়ার্টারে ফিরে যায়। মুক্তিবাহিনীর একটি গ্রুপ চন্ডিপুর ও ভিতরবন্দ বাজারে অস্থায়ী ক্যাম্প করে ।

তাতে টাপুরহাটে এক সাথে ট্রেনিং নেয়া কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে আমার সাাত হয়। পরে আমি তাদের সাথে যোগ দেই এবং কুড়িগ্রাম পৌছে কালীগঞ্জের যোগেন চন্দ্র সরকারের সঙ্গে দেখা হয় তিনি তখন কোম্পানী কমান্ডার। ৫ ডিসেম্বর প্রবল যুদ্ধের পর পাক হায়েনারা লেজগুটিয়ে নিলে ৬ ডিসেম্বর কুড়িগ্রাম মুক্ত হয়।

কুড়িগ্রাম থেকে আমরা তিস্তা বাধে এবং কাউনিয়ার পথেপথে যুদ্ধ করে রংপুরে প্রবেশ করি এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ও জর্জকোট সন্মুখে ৫ দিন অবস্থান করে বাড়ী চলে আসি। জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলেও আমার নাম শুধু ভারতের সাহেবগঞ্জ যুবশিবির, কোচবিহার ও টাপুরহাট ইউর্থ ক্যাম্প, আর যে সব যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার সেবা করেছি তাদের অন্তরেই আছে।

ভিতরবন্দ মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের বর্তমান কমান্ডার নাজিম উদ্দিন, ডিপুটি কমান্ডার শওকত আলী চাচা ও সদস্য আশরাফ আলী, হাসান আলী, হোসেন আলী, আব্দুস ছোবান ও আজিজার রহমান এদের সবার সঙ্গে এক সাথে ভারতের একই ক্যাম্পে ট্রেনিং নিয়ে এবং রণক্ষেত্রে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করেও বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় আমার নামটি নেই।

মোগলহাটের যুদ্ধে মারা গেলে কি আমার নামটি শহীদ তালিকায় থাকতো? তালিকায় নাম না ওঠানোর জন্য দায়ী কে আমার বয়স, নাকি কতৃপক্ষের অবহেলা না কি আমার নিয়তি?

লেখক: শফিউল আলম শফি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: সৃষ্টি বার্তা থেকে কপি করা যাবে না।