সৃষ্টি বার্তা

চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের মানুষ কেন ভারতমূখী !

অনেকই ‘রোগীরা ভারতে যাচ্ছে কেন’ এই নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এটি আমার কাছে খুব অস্বাভাবিক মনে হয় না। রোগীদেরকে যদি ক্লায়েন্ট হিসেবে ধরা হয় এবং তারা যে সেবাটি নিচ্ছেন সেটি যদি অর্থ দিয়ে নিয়ে থাকেন, তাহলে তাদের অধিকার আছে যেকোনো স্থান থেকে সেবা নেওয়ার। পাশের দেশ যদি এই ভোক্তা শ্রেণীকে টার্গেট করে পরিকল্পিত প্রচারণা চালিয়ে, আস্থায় নিয়ে তাদের দেশমুখি করতে পারে, সেখানে আমাদেরকেই নিজ করণীয় ঠিক করতে হবে।

ভারতের সরকারি হাসপাতালগুলোর অবস্থা বাংলাদেশের চেয়ে খুব বেশি বিপরীত নয়।ওখানেও প্রচুর অভাব স্থাপনা ভুল চিকিৎসা ফ্লোরে রোগী শুয়ে থাকা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজমান। মনে রাখতে হবে যে সকল রোগীরা পাশের দেশগুলোতে চিকিৎসা নেন তারা সেখানকার প্রাইভেট হাসপাতাল গুলোতে উচ্চ মূল্যে সেবা ক্রয় করে থাকেন। সেখানে গিয়েও তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। কিন্তু তারপরেও অব্যাহত প্রচারণার বিপরীতে আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি হওয়া হাসপাতালগুলো সমমানের সেবা নিশ্চিত করতে পারছে কি? সেবা নিশ্চিত হয়ে থাকলে সে তথ্যগুলো ভোক্তা শ্রেণীর কাছে পৌঁছাতে পারছে কি? পৌঁছানো সম্ভব নাহলে কেন হচ্ছে না সে বিষয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে কি? কষ্ট হলো আমরা সবাই ব্যস্ত, কে করবে?

এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে এযাবত কালে যত রিসার্চ হয়েছে, তার অধিকাংশই চিকিৎসার ফলাফল জনিত। কিন্তু রোগী বা তার অভিভাবক, ভোক্তা শ্রেণীর মানসিকতা, তাদের সামাজিক অবস্থান, তারা কি চায়, তাদের সেটিসফেকশন লেভেল, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এর ফ্যাক্টর সমূহ, সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি নিয়ে আজ পর্যন্ত কতগুলো রিসার্চ করা হয়েছে?

কোন মানদন্ডের ভিত্তিতে যাচাই করে রোগীরা তাদের পছন্দের চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠানগুলো বাছাই করছে সেটি নিয়ে কোন স্টাডি করা হয়েছে কি?

এদেশের যে সকল প্রতিষ্ঠান বা চিকিৎসকগণ সার্ভিস দিচ্ছেন তারা যথাযথ প্রফেশনালিজম বজায় রেখে নিজেদের সার্ভিস ডেলিভারি করতে পারছেন কি? আমি ফি নিচ্ছি কিন্তু তার বিপরীতে রোগী কতটুকু সার্ভিস চায়, সে বিষয়ে আমাদের যথার্থ আইডিয়া হয়েছে কি?

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে মনে রাখতে হবে, বিক্ষোভ মিছিল-সমাবেশ আর নেগেটিভ প্রচারণা চালিয়ে মানুষকে কোন আকর্ষন থেকে সাময়িক বিরত রাখা যাবে কিন্তু বেশিদিন আটকে রাখা যায়না। পরদেশীদের প্রচারণার ভাষা যাই হোক না কেন, মানুষ যদি তাতে কনভিন্স হয়, তাহলে তারা সে পথেই হাঁটতে থাকবে। কেন তারা বাইরে যাচ্ছে এ প্রশ্ন করা যেমন শিশুসুলভ। তেমনি নিজেরা কেন ধরে রাখতে পারছিনা, সেটি স্বীকার না করাটাও এক ধরনের কুপমন্ডুকতা।

বাজারে একটা কথা প্রচলিত আছে যে “চিকিৎসকরা বেশি প্রফেশনাল”। কিন্তু একজন রোগী বা রোগীর অভিভাবক হিসাবে আমার কাছে বিভিন্ন স্থানে সেবা নিয়ে এটাই মনে হয়েছে “সব মিলিয়ে আমাদের যেটি অভাব তাহলে, প্রফেশনালিজম’। বাংলাদেশের চিকিৎসকদের সত্তিকারের প্রফেশনাল হওয়া উচিত।

এদেশের মাটি আর মানুষকে আমাদের চেয়ে কেউ বেশি ভালোবাসে, বেশি সেবা দিতে পারবে, সেটি একটি মিথ্যা প্রচারণা। ভালোবাসার সাথে সত্যিকারের প্রফেশনালিজম নিয়ে আমরা যেদিন আমাদের ক্লায়েন্টদের স্যাটিসফেক্টরি লেভেলে সেবা দিতে পারব, সেদিন হয়তো তারা আমাদের ভালোবাসার টান ছেড়ে বহুদূরের পথ হাঁটতে চাইবেনা। অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইব্রাহিম, অধ্যাপক এম আর খান, জোহরা বেগম কাজী, অধ্যাপক এবিএম আবদুল্লাহ, অধ্যাপক মঈনুজ্জামান এর একজন উত্তরসূরী ছাত্র হিসেবে আমি সেটি প্রতিনিয়ত শেখার চেষ্টা করছি।

লিখেছেন-Dr. Muhibbur Rahman Rafe

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: সৃষ্টি বার্তা থেকে কপি করা যাবে না।