করোনার দাপটকালীন সময়ে ভেবে চিন্তে চলা-বলা জরুরি

অনলাইন ডেস্ক অনলাইন ডেস্ক

সৃষ্টিবার্তা ডটকম

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৪, ২০২০

বিশ্ব কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে প্রাণঘাতী নভেল করোনা ভাইরাস (কভিট-১৯)। করোনা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পুরো বিশ্ব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী বিশ্বে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ১২ এপ্রিল শনিবার পর্যন্ত ১৬ লক্ষ ১৪ হাজার ৬৫১।

মারা গেছে প্রায় ৯৯ হাজার ৮৮৭জন। বাংলাদেশেও এর প্রভাব শুরু হয়েছে। আইইডিসিআর এর তথ্যানুযায়ী এদেশে এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৬২১ জনে দাড়িয়েছে, যার মধ্যে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। নভেল করোনা ভাইরাস সংক্রমনের প্রভাবে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষনা করেছে সরকার। সংক্রমণ বিবেচনায় এ ছুটি তিন ধাপে বর্ধিত করা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত এই ভাইরাসে আক্রান্তদের জন্য কোনও প্রতিষেধক আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তাই সচেতনতার হয়ে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে এ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হিসেবে বলা হচ্ছে। দেশে সাধারণ মানুষকে অতিপ্রয়োজনীয় কাজ ব্যতিত বাসা-বাড়ির বাহিরে বের হতে নিষেধ করে চলছে বিভিন্ন প্রচার প্রচারনা। পুলিশ বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে চলছে মাইকিং এর মাধ্যমে প্রচার এবং সচেতনতা মুলক লিফলেট বিতরণ। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সচেতনতার সহিত চলাচল করতে এসব প্রচার প্রচারণা চলছে।

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হলো- শ্বাস কষ্ট, জ্বর, হাঁচি-কাশি ও পেটের পীড়া। হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়াতে পারে এই ভাইরাস। তাছাড়া আক্রান্ত কারও সংস্পর্শে গেলে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া সম্ভাবনা বেশি। সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন, প্রিন্ট পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে মানুষকে সচেতন করতে বিভিন্ন নিউজ ও ভিডিও ডকুমেন্টারি নিয়মিত প্রচার করা হচ্ছে। তারপরও দেখা যাচ্ছে কেন জানি আমরা সচেতন হতে পারছিনা। প্রশাসন, পুলিশ বিভাগসহ বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে সকলকে ঘরে অবস্থান করতে বলা হলেও অজ্ঞাত কারনে আমরা অযথাই ঘরের বাহিরে বের হচ্ছি। যদিও এর জন্য অনেককে জরিমানা গুণতে হচ্ছে। আমরা জরিমানা গুণলেও জীবনের ভয় করছি না।

বিভিন্ন গ্রামগঞ্জের দোকানপাট ও বাজার গুলোতে দেখা যায়, ঈদের ছুটির মত মানুষের ভীড়। মানুষ গ্রামে এসে ঘরে না থেকে সামাজিক দূরত্ব বজায় না রেখে বিনা প্রয়োজনে ঘুরাফেরা করছে। চায়ের দোকান, মুদির দোকান গুলোতে প্রায়ই দেখাযায় উপচেপড়া ভীড়। ল

আর এই সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসপত্রের দামও বৃদ্ধি করে চলছে। এতে মানুষ জিনিসের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কায় প্রয়োজনের তুলনায় অধিক পণ্য ক্রয়ের জন্যও ভীড় জমাচ্ছে দোকান গুলোতে। এতে করোনা ভাইরাস সংক্রমনের ঝুঁকি আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। সংক্রমণ রোধে অধিক কার্যকরি ভুমিকা পালনের জন্য পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‌্যাব এর পক্ষ থেকে চলছে টহল।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে বার বার সাবান পানি দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড হাত ধুতে বলা হচ্ছে। অতি প্রয়োজনে ঘরের বাহিরে গেলে মাস্ক পরার ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। কিন্তু রিক্সা, ভ্যান, অটোরিক্সা চালকসহ সাধারণ মানুষ অনেকেই মানছে না এসব পদ্ধতি। দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট এর মাধ্যমেও সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখায় এবং বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাহিরে বের হওয়ায় জরিমানা করা হলেও কিছু উৎসুক জনতা সেনাবাহিনী, মোবাইল কোর্ট দেখার জন্যও ঘরের বাহিরে বের হচ্ছে। যা জাতি হিসেবে লজ্জা জনক বটে।

অপর দিকে নভেল করোনা ভাইরাসের কারণে দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণার ফলে বিভিন্ন কলকারখানা ও পোশাক কারখানায় কর্মরত শ্রমিক ও বিভিন্ন পেশাজীবি, শ্রমজীবি মানুষের বাড়ি ফেরার ঢল শুরু হয়েছিল। অবশেষে গ্রামগঞ্জে যেন ঈদের আমেজ চলছিলো। পুনরায় ৫ এপ্রিল রবিবার অনেক গার্মেন্টস চালু হওয়ার কথায় সারাদেশ থেকে গার্মেন্টস কর্মী তাদের চাকুরী বাঁচাতে কর্মস্থলে গিয়ে হাজির হয়।

করোনা মোকাবেলায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গণপরিবহন চলাচল বন্ধ ঘোষনা করা হলেও চাকুরি বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ পিকআপ, পণ্যবাহী ট্রাকের মাধ্যমে গাদাগাদি করে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় কর্মস্থলে ফিরেছে। এতে করোনা ভাইরাস সংক্রমনের ঝুঁকি আরো বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। বিভিন্ন পত্র পত্রিকা ও টেলিভিশনের মাধ্যমে দেখা গেছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ বিভিন্ন দূর পাল্লার মানুষের উপচেপড়া ভীড়, এমনকি দেশের স্থল পথের মতো আরিচা-পাটুরিয়া ঘাটেও ভীড় ছিলো লক্ষনীয়। এসব স্থানে সেনাবাহীনি ও র‌্যাব এর টিম চেক পোস্ট বসিয়েও ভীড় কমাতে হিমশিম খেতে হয়েছে। আমরা যদি সচেতন না হই, আমাদের এ দেশ থেকে করোনা ভাইরাস সংক্রমন প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে বলে সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দরা মনে করছেন না। দেশের এহেন অবস্থায় সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্রে সাথে আমিও ঐকমত্য পোষন করছি।

ঢাকা শহরের প্রায় ৮০ ভাগ গার্মেন্টস কারখানা গাজীপুর ও সাভারে অবস্থিত। আর গত ২৬ মার্চ থেকে বন্ধ ঘোষনার পর, পুনরায় প্রতিষ্ঠানগুলো চালু হওয়ার কথায় গার্মেন্টসের প্রায় ৮০-৯০ ভাগ শ্রমিক গত দুই দিনে ঢাকায় ফিরে যায়। কর্মস্থলে গিয়ে অনেকে দেখেন তাদের কর্মস্থলের গেইট লাগানো। গার্মেন্টস কারখানাগুলো পুনরায় বন্ধের ঘোষনায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আবার তারা বাড়ি ফিরতে শুরু করেছিলো। কিন্তু সরকারের পক্ষথেকে ঢাকায় প্রবেশ ও বাহির হওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ করা হয়।

আর যারা ঢাকাতে থাকতে চাচ্ছে সেখানে যেসব এলাকার বাসাগুলোতে ভাড়ায় থাকতো সেখানকার বাড়ির মালিক করোনার ভয়ে তাদের আপাতত বাসায় উঠতে দিচ্ছে না, তাই এখন এক রকম বাধ্য হয়ে পুণরায় গ্রামের পথে পায়ে হেটে, মাছের ড্রামে, পণ্যবাহী ট্রাকে চাপাচাপি করে দাঁড়িয়ে বাড়ি ফিরতে শুরু করেছে যা বিভিন্ন তথ্যে দেখা যায়। আর এতেই একজনের শরীরে করোনা ভাইরাস এর সংক্রমণ থাকলে অতিদ্রæত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভবনা অনেকাংশে বেড়ে গেছে।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেক শ্রমিকরা বলছেন, ‘সরকার করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধ করার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নিলেও পোশাক কারখানার মালিকরা করোনাকে ডেকে নিয়ে আসছেন। তারা বলেন- মালিক ঘরে বসে বাঁচতে পারবে, আমরা শ্রমিকেরা ঘরে বসে থাকলে মালিকরা বেতন দেবে না। তাই মালিকদের কথামতো অফিসে না আসলে চাকরি চলে যেতে পারে! গত মাসের বেতনও হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে! তাই জীবন ঝুঁকি নিয়ে আমরা ছুটে আসাতে বাধ্য হয়েছি। অনেকে আবার এমন কথাও বলছেন যে, সরকার বা গার্মেন্টস মালিক সমিতি যদি একদিন আগেও আমাদের বন্ধের কথা জানাতো তাহলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ও কয়েক গুণ ভাড়া বেশি দিয়ে আমাদের গ্রাম থেকে কষ্ট করে ঢাকায় আসতে হতো না। যে কয় টাকা বেতন পাবো তা শুধু আসা-যাওয়া, বাড়ি ভাড়া ও দোকান বাকির টাকা দিলেই শেষ হয়ে যাবে।

সার্বিক বিবেচনায় করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। একমাত্র সচেতনতাই পারে আমাকে আপনাকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে। আসুন আমরা সচেতন হই, ঘরে থাকি, নিজে সুস্থ্য থাকি, অপরকে সুস্থ্য রাখি।

লেখক-
জিয়াউল হক জুয়েল
সম্পাদক ও প্রকাশক
চাষী সেবা ডট কম
ই-মেইল: ziaulhoquejowel@gmail.com