হাওরের কৃষকরা আবহাওয়ার দিকে তাকিয়ে

অনলাইন ডেস্ক অনলাইন ডেস্ক

সৃষ্টিবার্তা ডটকম

প্রকাশিত: এপ্রিল ২৬, ২০২০

হাওর অঞ্চলের সাতটি জেলার মানুষ এখন আবহাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। মেঘ গুড়গুড় করলেই তাদের কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। একদিকে তারা ধান কাটছেন, অন্যদিকে বাকি ধান ভালোভাবে তারা ঘরে তুলতে পারবেন কি-না, তা নিয়ে আতঙ্ক।

গত কয়েকদিন ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে বেশ কিছু জায়গায় ধানের ক্ষতি হয়েছে। সে কারণে হাওরবাসীর চিন্তায় এখন শুধু আবহাওয়া। তবে কোনো কোনো হাওরে ধান কাটা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ শেষ হয়েছে। আর ৪-৫ দিন ঝড়, বৃষ্টি, শিলা না হলে তারা পুরো ধান ঘরে তুলতে পারবেন।

আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আজ ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায়, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় এবং রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের দু-এক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। দেশের দক্ষিণাংশের কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ চমকানোসহ মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। বৃষ্টি, বজ্রসহ বৃষ্টি বা দমকা ঝড়ো হাওয়াসহ শিলাবৃষ্টি হলে চরম ক্ষতি হবে হাওর অঞ্চলে। এই আশঙ্কা ধান ঘরে না ওঠা পর্যন্ত হাওরবাসীর থাকবে।

এবার হাওর অঞ্চলে ধান ঘরে তোলার জন্য সরকারের দেয়া ধানকাটা যন্ত্র হারভেস্টার, রিপার সরবরাহ ও শ্রমিক ছাড়াও ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগও ধান কেটে কৃষকের ঘরে তুলে দিচ্ছে। এত কিছুর পর এখনও ৫৬ ভাগ ধান কাটা বাকি হাওরে। এ কারণেই কৃষকের মনে আতঙ্ক। কারণ আবহাওয়া কখন কোন খেলা খেলে তা বলা মুশকিল। তবে আগামী ১০ দিনের মধ্যে হাওরের ধান কাটা শেষ করা যাবে বলে আশা করছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা।

নেত্রকোনা জেলার তিনটি হাওর অঞ্চল খালিয়া জুরি, মদন ও মোহনগঞ্জ। এ তিনটি হাওরের মধ্যে খালিয়াজুড়িতে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ, মদনে ৫০ ভাগ ও মোহনগঞ্জে ৫০ ভাগ ধান কাটা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। গড়ে এ তিন উপজেলায় ৬০ ভাগ ধান কাটা শেষ হয়েছে। নেত্রকোনার কৃষকরা এবার ধানের দামও পাচ্ছেন ভালো। তারা জমি থেকে কেটেই প্রতি মণ ভেজা ধান ৬৫০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি করছেন।

কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছেন, শনিবার (২৫ এপ্রিল) পর্যন্ত হাওরের ৪৪ শতাংশ বোরো ধান কেটে কৃষক ঘরে তুলতে পেরেছে। তিনি বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নানা উদ্যোগের ফলে হাওরের কৃষকেরা ভালোভাবে ধান কাটতে পারছেন। ইতোমধ্যে ৪৪ শতাংশ ধান কেটে ঘরে তুলতে পেরেছেন কৃষকরা। অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত বা আগাম বন্যা না হলে যে গতিতে ধান কাটা চলছে, আমরা আশাবাদী হাওরের কৃষকরা সময়মতো ধান ঘরে তুলতে পারবেন।

এবার বোরো মৌসুমে সারাদেশে ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় এবার দুই কোটি ৪ লাখ মেট্রিক টন চালের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

সারাদেশে বোরো ধান কাটার সময় এখনও পুরোপুরি শুরু হয়নি। যারা আগাম কিছু বি২৮ ধান লাগিয়েছেন, তারা এখন ধান কাটছেন। সারাদেশে ধান কাটার মৌসুম শুরু হতে এখনও ১০ থেকে ১৫ দিন সময় লাগবে। তবে হাওর অঞ্চলের আগাম ধান লাগানো হয় বিধায় এ ধান আগাম পাকে। দেশের হাওরবেষ্টিত সাত জেলায় বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৭ লাখ ৪৫ হাজার মেট্রিক টন, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ২০ ভাগ।

কৃষিসচিব মো. নাসিরুজ্জামান জানান, হাওর অঞ্চলের ধান দ্রুত ঘরে তোলার জন্য সরকার কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ধান কাটার জন্য জরুরিভিত্তিতে ১৮০ কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ১৩৭টি রিপার বরাদ্দ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।বর্তমানে হাওর অঞ্চলে ৩৬২টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও এক হাজার ৫৬টি রিপার সচল রয়েছে। এছাড়া ২২০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টার ও ৪৮৭টি রিপার দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। হাওরের বোরো ধান কাটার জন্য আমরা জরুরিভিত্তিতে এসব যন্ত্রপাতি বরাদ্দ করেছি। এর ফলে এই অঞ্চলে ধান কাটার আর কোনো সমস্যা হবে না বলে আশা করছি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. আবদুল মুঈদ এক প্রশ্নের জবাবে  কে বলেন, ‘এবার ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। আর চালের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই কোটি চার লাখ মেট্রিক টন। এবার ধানের যে ফলন হয়েছে আশা করি, চালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।’

তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ৫০ ভাগ (মূল্য) পরিশোধের মাধ্যমে ধান কাটার মেশিন দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিবার শ্রমিক সংকটের কারণেই ধানকাটার যন্ত্র সরবরাহ করা হয়েছে। কৃষকের ঘরে ধান তোলার তোলার জন্য সরকার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ইতোমধ্য হাওরের বাঁধগুলো নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয়েছে। আশা করছি, সুন্দরভাবে কৃষকরা হাওরের ফসল ঘরে তুলতে পারবেন। তিনি আরও বলেন, আগামী জুনের মধ্যে ৬৪ জেলায় তিন ক্যাটাগরির কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন-কম্বাইন্ড হারভেস্টার, রিপার এবং রাইস ট্রান্সপ্লান্টার সরবরাহ করা হবে।