বৃদ্ধা মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল চার মেয়ে ও ছেলে

অনলাইন ডেস্ক অনলাইন ডেস্ক

সৃষ্টিবার্তা ডটকম

প্রকাশিত: মে ৯, ২০২০

৯৫ বছরের বৃদ্ধা ইশারন নেছাকে ‘বোঝা’ মনে করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে তার নিজের চার মেয়ে ও সৎ ছেলে। কেউ তাকে আর রাখতে চান না। নিরুপায় বৃদ্ধা বাজারের এক দোকানের সামনে আশ্রয় নিয়ে দিন-রাত কেঁদে চলেছেন।করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই সন্তানরা তাকে বের করে দিয়েছেন বাড়ি থেকে। কোনো সন্তানই তাকে দেখভালের দায়িত্ব নিতে রাজি না হওয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন জনপ্রতিনিধিরাও।এ ঘটনা পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের।স্থানীয়রা জানান, মুক্তিযুদ্ধের পর পরই ইশারন নেছার স্বামী মজত আলী মারা যান। পাঁচ মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে মারা গেছেন। বাকি চার মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন বিভিন্ন এলাকায়। তিন মেয়ের স্বামীর বাড়ি মির্জাপুর ইউনিয়নেই। স্বামী মারা যাওয়ার পর ওই বৃদ্ধা তার স্বামীর ভিটায় থাকতেন। সৎ ছেলেদের একজন তাকে দেখভাল করতেন।কিন্তু সেই সন্তানও মারা গেলে সবকিছু বিক্রি করে একই ইউনিয়নের পাখোরতলা গ্রামে সেজ মেয়ে আজিমা বেগমের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন বৃদ্ধা। ১৫/১৬ বছর ধরে সেখানেই রয়েছেন। ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

গত এক মাস আগে এক মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পিছলে পড়ে পায়ে আঘাত পান ইশারন। তারপর থেকে হাঁটতে পারেন না। এই অবস্থায় মাকে টানতে না পেরে তার মেয়ে আজিমা তাকে রেখে আসেন সৎ ভাই জাহিরুলের বাড়িতে। জাহিরুল ও তার ছেলে সলেমান তাকে একমাস দেখাশোনা করার পর তাকে আবার রেখে আসেন আজিমার বাড়িতে। কয়েকদিন পর আজিমা আবার রেখে আসেন জাহিরুলের বাড়িতে।এভাবে এক পর্যায়ে তারা বুধবার (০৬ মে) সন্ধ্যায় তাদের মাকে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে রেখে চলে যান। রাত হলেও তাকে কেউ বাড়িতে নেয়ার উদ্যোগ নেননি। রাতে স্থানীয় কয়েকজন যুবক বৃদ্ধার খাবারের ব্যবস্থা করেন। পরে ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা তার মেয়ে আজিমার বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।কিন্তু বৃহস্পতিবার (০৭ মে) দুপুরে আজিমা আবারও তার মাকে মির্জাপুর উত্তরা বাজারের একটি দোকানের সামনে রেখে চলে যান। সন্ধ্যায় ঝড় বৃষ্টি শুরু হলেও কোনো সন্তানই তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেননি। ফলে শুক্রবার (০৮ মে ) পর্যন্ত সেখানে বসে কাঁদতে দেখা গেছে ওই বৃদ্ধা।

কাঁদতে কাঁদতে ইশারন নেছা বলেন, ‘আমার কেউ নেই। প্রয়োজনে আপনারা আমার স্বামীর ভিটায় একটা ঘর তুলে দিন। আমি সেখানেই যেন মরতে পারি। মেয়ে ও সৎ ছেলে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে।  (বুধবার) সবাই মিলে আমাকে মেয়ে আজিমার বাড়িতে রেখে আসে। আবার আমাকে বাজারে রেখে চলে গেছে।’তার সৎ ছেলে জাহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি অত্যন্ত দরিদ্র। তারপরও একমাস আমার বাড়িতে রেখেছিলাম। কিন্তু তিনি বিছানাতেই প্রস্রাব-পায়খানা করেন। আমার স্ত্রীও অসুস্থ। তাই তাকে দেখভাল করা সম্ভব হচ্ছে না বলে আজিমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেই। এখন তার আপন মেয়েই তাকে আর রাখতে চাইছে না।’মেয়ে আজিমা বেগম বলেন, ‘আমি নিজেই অসুস্থ। মাকে পরিচর্যা করবো কিভাবে? মাকে রাখার মতো আমার কোনো ঘরও নেই। হাঁটতে পারেন না, তাই ঘরেই প্রস্রাব-পায়খানা করেন। আমি খুব কষ্ট করে জীবন যাপন করছি। তাই সৎ ভাইয়ের কাছে রেখে এসেছিলাম।’স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, ‘এই বয়সে বৃদ্ধাকে তার সন্তানরা বের করে দিয়েছেন, এটা অমানবিক। তিনি চলাফেরা করতে পারেন না। এই অবস্থায় তার সন্তানরাই পারেন তাকে কাছে রাখতে। বিশেষ করে তার যেই মেয়ের কাছে দীর্ঘদিন ছিলেন, তার একটু সদয় হওয়া উচিত। প্রয়োজনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ আমরা এলাকাবাসীও সহযোগিতা করবো। কিন্তু তার সেবা-যত্নের দায়িত্ব তার সন্তানদেরকেই নিতে হবে।’

মির্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘ওই বৃদ্ধাকে নিয়ে আমরা বিপাকে পড়ে গেছি। তার নিজের মেয়ে ও সৎ ছেলে কেউ তাকে নিতে রাজি হচ্ছেন না। চাল-ডাল দিয়ে আমরা গতকাল (বুধবার) তার মেয়ে আজিমার বাড়িতে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু  (বৃহস্পতিবার) দেখি, আবার তাকে বাজারে রেখে গেছেন।’ইউপি চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওমর আলী বলেন, ‘ওই বৃদ্ধা তার সবকিছু বিক্রি করে সব টাকা পয়সা নিয়ে মেয়ে আজিমার বাড়িতে ওঠেন। ভিক্ষা করে যা পেতেন, সব মেয়েকে দিয়ে দিতেন। পায়ে আঘাত পেয়ে এখন ভিক্ষা করতে পারেন না। তাই তাকে তার মেয়ে আর রাখতে চাইছেন না। আমরা প্রয়োজনে সহযোগিতা করতে পারি। কিন্তু দেখভালের দায়িত্ব কিন্তু তো তাদেরই নিতে হবে।’