খবর পেয়ে আগেই অন্যান্য গ্রাম থেকে আত্মীয়-স্বজনরা চলে এসেছেন। সারারাত বাড়ির কেউ ঘুমাননি। সোমবার (৬ জুন) ভোর ৪টায় ইব্রাহিম হোসেনের (২৭) মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি উঠানে এসে দাঁড়াতেই স্বজনদের কান্নায় পুরো এলাকা ভারী হয়ে ওঠে।
চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ইব্রাহিমের দুই বোন সেলিনা ও হালিমা বলেন, ‘ভিডিও করতি করতি কী একটা ছুটে আইসে আমার ভাইয়ের মাথায় লাগে। মা কোয়ে (বলে) চিল্লান দিয়ে আর কথা কোয়নি। আমার ভাই কী করে ফুরোয় গেলো রে। ভাইতো আর আসবে না কোনোদিন রে।’
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বেসরকারি বিএম কনটেইনার ডিপোতে বিস্ফোরণ ও আগুনে ৪৯ জন মারা গেছেন। তাদের একজন ইব্রাহিম হোসেন। তিনি যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার জহুরপুর ইউনিয়নের নরসিংহপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত মাদ্রাসাশিক্ষক আবুল কাশেম মুন্সীর ছোট ছেলে।
জানা গেছে, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এক্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টের শিপিং সহকারী পদে চাকরি করতেন ইব্রাহিম। একই প্রতিষ্ঠানের অন্য শাখায় কাজ করেন তার খালাতো ভাই নাজমুল হোসেন।
তিনি বলেন, ‘শনিবার (৪ জুন) রাত ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে ইব্রাহিম আগুনে দগ্ধ হয়। তার আগে সে বাড়িতে মা, বাবা ও স্ত্রীসহ অন্য স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে। তার মাথার পেছনে ও পেটে আঘাত ও আগুন লাগে। মুখ, টি-শার্ট ও মোবাইল ফোন দেখে তাকে শনাক্ত করি। উদ্ধারের সময় তার ফোনটি সচল ছিল।’
আরেক খালাতো ভাই শিমুল হোসেন বলেন, ‘শনিবার রাতে অনেকের মতো ইব্রাহিমও অগ্নিকাণ্ডের ভিডিও ফেসবুকে লাইভ করছিলেন। কিছু সময় পর হঠাৎ ডিপোর কনটেইনারগুলোতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর ঘটনাস্থলে গিয়ে খোঁজাখুঁজি করে তাকে পাওয়া যায়নি। পরদিন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে লাশ পাওয়া যায়।’
ইব্রাহিমের মৃত্যুর খবরে রবিবার (৫ জুন) সকাল থেকে প্রতিবেশী, গ্রামবাসী ও আত্মীয়রা তাদের বাড়িতে ভিড় করতে থাকনে। এদিকে ছেলের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না মা দুলুপি বেগম ও বাবা আবুল কাশেম। জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে স্ত্রী মুন্নি খাতুন যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। তিনি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আগামী ২৮ জুলাই সন্তান ভূমিষ্টের সম্ভাব্য দিন ছিল।
ইব্রাহিমের মা বলেন, ‘শনিবার রাত ৯টায় আমার ছেলের সাথে শেষ কথা হয়। কোরবানির ঈদে বাড়ি এসে সন্তানের মুখ দেখতে চেয়েছিল। ছেলে হলে মাদ্রাসায় পড়াতে চেয়েছিল, হাফেজ বানাতে চেয়েছিল। আমার ছেলের সেই আশা আর পূরণ হলো না।’
জহুরপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান মিন্টু জানান, পাঁচ বছর আগে প্রাণ-আরএফএল কোম্পানিতে চাকরি পান ইব্রাহিম। দেড় বছর আগে নিজ গ্রামেই বিয়ে করেন। তার এমন মৃত্যুতে পুরো গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সকাল ৯টায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।