মহামারি করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে আরও কড়াকড়ি ও বিধিনিষেধ আরোপ করছে ইউরোপের দেশগুলোতে। ইস্টার সানডের ছুটি পালনে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ইতালিতে ফের লকডাউন জারি করা হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগী বাড়তে থাকায় দেশজুড়ে চার সপ্তাহের লকডাউনে যাচ্ছে ফ্রান্স। শনিবার এক সরকারি আদেশে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, আগামী মঙ্গলবার থেকে লকডাউন কার্যকর হবে দেশটিতে।
আদেশে ম্যাক্রোঁ জানান, লকডাউন জারির ফলে আগামী মঙ্গলবার থেকে ফ্রান্সের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নিত্য-প্রয়োজনীয় পন্য সামগ্রী বিক্রি করে না— এমন দোকান ও বিপণীবিতানগুলো বন্ধ থাকবে; দেশজুড়ে সন্ধ্যা সাতটা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত জারি থাকবে কারফিউ।
এছাড়া লকডাউন চলাকালে কোনো ব্যক্তি যদি আবাসস্থল থেকে ১০ কিলোমিটারের অধিক দূরের কোনো জায়গায় যেতে চান, সেক্ষেত্রে অবশ্যই তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের যৌক্তিক কারণ দর্শাতে হবে।
ব্রিটেনে টিকাদান শুরু হলেও লকডাউন চলছে। দেশটিতে ছয়জনের বেশি জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সামাজিক ও পারস্পরিক দূরত্ববিধি ও মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। এর মধ্যেই বাংলাদেশ, পাকিস্তান, কেনিয়া ও ফিলিপাইনসহ ৩৫টি দেশকে ‘বিপজ্জনক’ ঘোষণা করে এর নাগরিকদের প্রবেশাধিকারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ব্রিটেন।
সেই সঙ্গে বলা হয়েছে, নতুন ভেরিয়ান্টের করোনার বাড়বাড়ন্ত রুখতে ব্রিটেন থেকে ওই সব দেশে সফরও করা যাবে না।
করোনার তৃতীয় ঢেউ চলা ইতালিতে ইস্টার সানডেকে ঘিরে জনসমাগম ঠেকাতে তিন দিনের কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় অপ্রয়োজনে বাইরে ঘোরাঘুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে এ ধর্মীয় অনুষ্ঠান উদযাপনে কোনো বাধা নেই। দেশটির সব অঞ্চলকে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া নির্দেশনায় গির্জাগুলো উন্মুক্ত থাকলেও উপাসকদের তাদের নিজস্ব অঞ্চলের পরিষেবাগুলোতে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। গত বছরের মতো এবারও পোপ ফ্রান্সিস জনশূন্য সেন্ট পিটার্স স্কয়ারে ‘ইস্টার’-এর বক্তৃতা করবেন। ছুটির পরেও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে এই মাসের শেষ অবধি কমলা অঞ্চল বা রেড জোন এলাকায় কিছু বিধিনিষেধ থাকবে।
কঠোর লকডাউনের নিয়ম বাস্তবায়নে দেশব্যাপী ৭০ হাজার অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করার ঘোষণা দিয়েছে ইতালি সরকার।
এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, পাঁচ সপ্তাহ আগে ইউরোপে সাপ্তাহিক নতুন সংক্রমণের সংখ্যা ১০ লাখের নিচে নেমে এসেছিল। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে এই অঞ্চলে করোনা সংক্রমণ বেড়ে গেছে। নতুন করে ১৬ লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। ইউরোপে করোনায় মোট মৃত্যু দ্রুত ১০ লাখের দিকে এগোচ্ছে।
সংস্থাটি বলছে, এই অঞ্চলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঢেউ আশঙ্কাজনক। ইস্টার সানডের ছুটিতে সংক্রমণ ও মৃত্যুতে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আজ রোববার থেকে শুরু হচ্ছে ইস্টার সানডের ছুটি।
আগে থেকে চলমান লকডাউনের মধ্যে নতুন করে আরও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে ব্রিটেন। শনিবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, আগামী ৯ এপ্রিল ব্রিটেনের স্থানীয় সময় ভোর ৪টা থেকে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া যাত্রীদের ক্ষেত্রে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।
ওই দিন যুক্তরাজ্য ভ্রমণের ‘রেড লিস্টে’ বাংলাদেশের পাশাপাশি পাকিস্তান, ফিলিপাইন্স ও কেনিয়াও যুক্ত হবে। এ তালিকায় আগে থেকেই আরও ৩৫টি দেশ রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্টের ভ্রমণবিষয়ক গাইডলাইনে বলা হয়েছে, কোনো যাত্রী যদি এসব দেশ থেকে ব্রিটেনে যাওয়ার চেষ্টা করেন বা সর্বশেষ ১০ দিনের মধ্যে ওই তালিকার কোনো দেশে ভ্রমণ করে থাকেন, তাহলে তিনি ব্রিটেন প্রবেশের অনুমতি পাবেন না।
তবে তিনি যদি ব্রিটিশ বা আইরিশ নাগরিক হয়ে থাকে, অথবা যুক্তরাজ্যে যদি তার বসবাসের অনুমতি থেকে থাকে, তাহলে তাকে ঢুকতে দেওয়া হবে। তবে সেজন্য তাকে বাধ্যতামূলকভাবে সরকার নির্ধারিত হোটেলে নিজের খরচে ১০ দিন কোয়ারেন্টিনে কাটাতে হবে।
গাইডলাইনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ফিলিপাইন্স ও কেনিয়া থেকে কোনো যাত্রী ৯ এপ্রিল ব্রিটিশ সময় ভোর ৪টার যুক্তরাজ্যে পৌঁছালে তাকে ঢুকতে দেওয়া হবে। তবে তাকে নিজের বসবাস স্থলে ১০ দিন ‘সেলফ আইসোলেশনে’ থাকতে হবে।
সেখানে পৌঁছানোর পর দ্বিতীয় ও অষ্টম দিন দুই দফা করোনা পরীক্ষায় উৎরাতে পারলে তবেই তাদের বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় বাংলাদেশও ভ্রমণ কড়াকড়ি বাড়িয়েছে।
করোনা মহামারি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জার্মানির মানুষকে ‘শান্ত পরিবেশে’ ইস্টারের ছুটি কাটাতে বলেছেন চ্যান্সেলর ম্যার্কেল৷
জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল মানুষের উদ্দেশ্যে ইস্টারের ছুটির সময়েও কড়া সরকারি বিধিনিয়ম মেনে চলার আবেদন জানিয়েছেন৷ তার মতে, এমন আচরণের মাধ্যমে সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব৷ এমনকি সেই গতি থামিয়ে ধীরে ধীরে কমিয়ে আনাও যেতে পারে বলে ম্যার্কেল মনে করেন৷
জার্মানির ইন্টেনসিভ ও এমারজেন্সি চিকিৎসা সংগঠনের এক বিশেষজ্ঞের মতে, জার্মানির করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই সপ্তাহের কড়া লকডাউন, আরো দ্রুত টিকা দেওয়ার উদ্যোগ এবং স্কুল ও হাসপাতালে বাধ্যতামূলক করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে৷ তার এ মতামত আমলে নেয়া হচ্ছে।
ওয়ার্ল্ডোমিটার বলছে, করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর দিক থেকে বিশ্বের চতুর্থ শীর্ষস্থানে রয়েছে ফ্রান্স। এই তালিকায় তার আগে থাকা দেশগুলো হলো যথাক্রমে ভারত (৩য় স্থান), ব্রাজিল (২য় স্থান) এবং যুক্তরাষ্ট্র (১ম স্থান)।