আল্ট্রাসনোগ্রাম করে স্ত্রীর গর্ভে মেয়ে সন্তানের খবর জানার পর গর্ভবতী স্ত্রীকে রেখে চলে যান স্বামী। এরপর থেকে শুরু হয় স্বামীর পরিবারের অমানুষিক নির্যাতন। শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর পরিবারের সব ধরণের লাঞ্ছনা-বঞ্চনা সহ্য করে অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য দাঁত কামড়ে স্বামীর বাড়িতেই পড়ে থাকেন স্ত্রী।
তবে শেষ পর্যন্ত সন্তান জন্মের পরও মন গলেনি স্বামী ও শ্বশুর-শাশুড়ির। সন্তান জন্ম দেওয়ার আনন্দ ম্লান করে তালাকের খবর দিয়ে সন্তানসহ স্ত্রীকে তাড়িয়ে দেয় তারা। ঘটনাটি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের নলডাঙ্গা ইউনিয়নের ঘোড়ামারা গ্রামের।
পাঁচদিন বয়সী সন্তান নিয়ে গৃহবধূ রোকসানা বেগম শঙ্কা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় পার করছেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সর্বানন্দ ইউনিয়নের ধনিয়ারকুড়া গ্রামে বাবার বাড়িতে। শুক্রবার (১২ মার্চ) সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে রোকসানা বেগমের সঙ্গে সময় নিউজের প্রতিবেদকের কথা হয়।
রোকসানা জানান, গত বছরের ১০ জুন সাদুল্লাপুরের নলডাঙ্গা ইউনিয়নের ঘোড়ামারা গ্রামের মহব্বর আলীর ছেলে রাজা মিয়া’র সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় তার। বিয়ের কিছুদিন পর সন্তান সম্ভবা হয়ে পড়ে রোকসানা। মাস চারেক পর গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ পরিচয় জানতে আল্ট্রাসনোগ্রাম করায় তার স্বামী।
আল্ট্রাসনোগ্রামের ফলাফল জানার পর বাঁধে বিপত্তি। গর্ভের সন্তান মেয়ে জানার পর থেকেই রোকসানার সাথে দূরত্ব তৈরি করে তার স্বামী রাজা মিয়া ও পরিবারের লোকজন।
স্ত্রী রোকসানাকে বাবার বাড়িতে রেখে ঢাকায় চলে যায় রাজা। এরপর শ্বশুর-শাশুড়ি ও পরিবারের লোকজনের অন্যায় অত্যাচার বাড়তে থাকে। শ্বশর বাড়িতে পানি তোলার মটর সচল থাকলেও বন্ধ করে দেয় তারা। গর্ভাবস্থায় টিউবওয়েল চেপেই পানি নিতে হয় রোকসানাকে। অন্তঃসত্ত্বা রোকসানার বাড়তি যত্ন তো দূরে থাক চারটে ভাত আর অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের চিন্তা করে সেখানেই থাকেন তিনি।
রোকসানা জানায়, তার ধারণা ছিল সন্তান জন্মের পর হয়তো স্বামীর মন গলবে। কিন্তু না, ঘটল উল্টো ঘটনা। গত ৮ মার্চ প্রসব বেদনা উঠলে স্বামী-শ্বশুর-শাশুড়ি পাশে দাঁড়ায়নি। ফুফা শাশুড়ি কোহিনুর বেগম আর মাকে নিয়ে রংপুরে যান রোকসানা। সেখানে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশনে কন্যা সন্তান জন্ম দেন তিনি।
এরপর তার মোবাইল নম্বর ব্লাকলিস্টে রাখায় স্বামী-শাশুড়ি কারও সাথে যোগাযোগ করতে পারেননি। ফুফা শাশুড়ি কোহিনুর বেগমও চলে আসেন ক্লিনিক থেকে। পরে তার মা ধার দেনা করে ক্লিনিকের বিল পরিশোধ করে মেয়ে আর নাতনীকে নিয়ে ফিরে আসেন।
বৃহস্পতিবার (১১ মার্চ) দুপুরে কন্যা সন্তানসহ রোকসানা স্বামীর বাড়িতে গেলে বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে সবাই সটকে পড়েন। শ্বশুর মহব্বর আলী দূর দূর করে তাড়িয়ে জানিয়ে দেন তার ছেলে রাজা তিনমাস আগেই তাকে তালাক দিয়েছে। পরে বাধ্য হয়ে ৯৯৯-এ কল দিলে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সাদুল্লাপুর থানা থেকে পুলিশ যায় রোকসানার স্বামীর বাড়িতে। কাউকে না পেয়ে রোকসানাকে বাবার বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেয় পুলিশ।
এ ব্যাপারে রোকসানার স্বামী রাজা মিয়া দাবি করেন, বিয়ের পর তিনি জানতে পারেন তার স্ত্রী রোকসানা পেটে বাচ্চা নিয়ে তাকে বিয়ে করেন। বিষয়টি জানলে বিয়ের একমাস পরই তিনি স্ত্রী রোকসানাকে তালাক দেন।
রাজা বলেন, সন্তান সম্ভবা থাকা অবস্থায় তালাক দেয়া যায় না, সেজন্য তিনি তালাকের বিষয়টি গোপন করেন।
সাদুল্লাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুদ রানা জানান, এ ঘটনায় থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তারা আইনগত ব্যবস্থা নেবেন।