সাত বছর আগেও শীতকালে প্রচুর পাখি আসত এ গ্রামে। এখন আর কোনো পাখি আসে না। কয়েক বছর ধরেই ইটভাটার মালিকরা বিধিবিধান না মেনে ও কোনো দপ্তরের অনুমতি না নিয়ে ভাটায় ইট তৈরি ও পোড়ানোর কাজ করে যাচ্ছে। এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হরি নদীর খননকৃত মাটি। কয়লার পরিবর্তে পোড়ানো হচ্ছে নারকেল, শিরীষ, বাবলা, বাঁশ ও খেঁজুর গাছের কাঠের গুঁড়ি। ফলজ ও বনজ গাছ কেটে কাঠ পোড়ানোর কারণে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। কাঠ পোড়ানো কালো ধোঁয়ায় পুরো এলাকা আচ্ছন্ন থাকে। এ এলাকা নারকেল ও খেজুরের রসের জন্য সমৃদ্ধ ছিল। গত কয়েক বছরে এ দুটি গাছের অবশিষ্ট নেই এলাকায়।
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় একটি গ্রামে ১৩টি ইটভাটা স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় লোকজন কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানোর কাজ করে। এতে একদিকে ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশের, অন্যদিকে অসুস্থ হচ্ছে সাধারণ মানুষ। ডুমুরিয়া উপজেলার ধামালিয়া ইউনিয়নের চেঁচুড়ি এলাকায় এসব ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এই গ্রামের মধ্যেই চেঁচুড়ি কে.বি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চেঁচুড়ি কে.বি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও চেঁচুড়ি দাখিল মাদ্রাসা রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গা ঘেঁষে পাড়া-মহল্লার ভেতরেই গড়ে তোলা হয়েছে এসব ইটভাটা। আধা কিলোমিটার দূরে রয়েছে এলাকার একমাত্র ভবদহ কলেজ।
সরেজমিন দেখা গেছে, চেঁচুড়ি গ্রামের পালপাড়া মহল্লার মধ্যে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘেঁষে ১৩টি ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয় ভাষায় একে ‘পাঁজা’ও বলা হয়। গ্রাম্য সংস্কৃতির কালেভদ্রে কোনো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এমনিভাবে ইট পুড়িয়ে বাড়ি তৈরি করে থাকতেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই এলাকায় ব্যবসার উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে প্রতিবছর কোটি কোটি ইট তৈরি করে তা বিক্রি করে আসছে এলাকার কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। চেঁচুড়ি কে.বি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চেঁচুড়ি কে.বি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং চেঁচুড়ি দাখিল মাদ্রাসার পাশ ঘেঁষে মাত্র ২-৩শ গজের ভেতর গড়ে উঠেছে ইটভাটাগুলো। অতিরিক্ত লোড দিয়ে কাঠ ও ইট বহনের ফলে গ্রামের রাস্তা ধসে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এমন অভিযোগ করেন দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েকজন শিক্ষক ও স্থানীয়রা। কাঠ পোড়ানোর কালো ধোঁয়ায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ বাসিন্দারা প্রায়ই নানান অসুস্থতায় ভোগেন।
সূত্র জানিয়েছে, চলতি নভেম্বর মাসের শুরু থেকে এলাকার মোহন পাল, সুভংকর পাল, মিলন পাল, অসিত পাল, মহাদেব পাল, নকুল পাল, বাসুদেব পাল, ভোলা নাথ পাল, অসীম পাল, সুবোল পাল, গৌতম পাল, শশধর পাল ও সাধন পাল ইটভাটা কার্যক্রম শুরু করেছেন। আরও কয়েকজন প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জানতে চাইলে ভাটা মালিক মোহন পাল, মহাদেব পালসহ একাধিক মালিক এ প্রতিবেদককে জানান, এক সময় তাদের পৈতৃক পেশা ছিল কুমার শিল্প যা এখন বিলুপ্তির পথে। এ কারণে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হিসাবে এবং চাহিদার কথা বিবেচনা করে ইট পোড়ানো শুরু করেন তারা। কোনো দপ্তরের অনুমতি ছাড়া স্থানীয় প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতায় বিভিন্ন ব্যক্তিও প্রতিষ্ঠানকে ম্যানেজ করে তারা ইটভাটার সব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো সমস্যা দেখা দিলে তারাই দেখভাল করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চেঁচুড়ি কে.বি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামরুল ইসলাম বলেন, সারাদিন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকে পুরো এলাকা। ছেলেমেয়েরা প্রায়ই অসুস্থ থাকে।
ইটভাটা পরিচালনার বিষয়ে কোনো ট্রেড লাইসেন্স এবং পরিবেশের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ধামালিয়া ইউপি চেয়ারম্যান এম. জহুরুল হক বলেন, যারা ইট পোড়ায় তারা কারও কথা শোনে না। স্থানীয় কয়েকজনকে ম্যানেজ করে তারা এ কাজ করে। তাদের লাইসেন্স নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার শরীফ আসিফ রহমান বলেন, বিষয়টি নিয়ে কেউ আমাকে কোনো অভিযোগ করেনি। নিয়মনীতি অমান্য করে অবৈধভাবে পরিচালিত সব ইটভাটার বিরুদ্ধে অচিরেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
#যুগান্তর