গত ৮ এপ্রিল দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা অনলাইন ও প্রিন্ট ভার্সনে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মেদুয়ারী ইউনিয়নের বগাজান গ্রামের আব্দুস সাত্তারের মেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থী হাফসা আক্তারকে নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ হয়। সংবাদটি ভালুকা আসনের এমপি মো. আব্দুল ওয়াহেদের দৃষ্টিগোচর হয়। ওই শিক্ষার্থীর ঢাবিতে ভর্তির জন্য বুধবার তিনি পরিবারের হতে নগদ ৫০ হাজার টাকা তুলে দেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- লোহাবৈ আব্দুল হেকিম সরকার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতিকুর রহমান, সহকারী প্রধান শিক্ষক রওশন আরা, সহকারী শিক্ষক (বিএসসি) আরিফ রব্বানী সোহাগ, দৈনিক যুগান্তরের ভালুকা প্রতিনিধি জহিরুল ইসলাম জুয়েল, হাফসা ও তার মা বাবা।
সংসদ সদস্য মো. আব্দুল ওয়াহেদ জানান, যুগান্তরে প্রকাশিত সংবাদ দেখে হাফসার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ৫০ হাজার টাকা দেয়া দিলাম। ভবিষ্যৎ এ হাফসার পড়ালেখার খরচ চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন। ভালুকার কোনো শিক্ষার্থী অর্থের অভাবে লেখাপড়া বন্ধ হবে না।
এর আগে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ভালুকা থেকে যে সব শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ প্রাপ্ত হবে প্রতি শিক্ষার্থীকে এককালীন ১০ হাজার বৃত্তি প্রদানের আশ্বাস দেন এমপি।
প্রসঙ্গ, ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মেদুয়ারী ইউনিয়নের বগাজান গ্রামের হত দরিদ্র আব্দুস সাত্তারের মেয়ে হাফসা আক্তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেলেও দারিদ্র্যতার কারণে অর্থাভাবে ভর্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও হাফসা আক্তার জাহাঙ্গীর নগর ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তি পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, আব্দুস সাত্তার ও নাজমা আক্তার দম্পতির তিন কন্যার মাঝে বড় মেয়ে হাফসা আক্তার। তাছাড়া তার মেঝো বোন সুমাইয়া আক্তার (১২) শারীরিক ও বাক প্রতিবন্ধী এবং জান্নাতুল ফেরদৌসী (৫) নার্সারিতে পড়ে। জান্নাতুল ফেরদৌসীও বেশ মেধা সম্পন্ন। মা নাজমা আক্তার এক সময় গার্মেন্টসে চাকরি করতেন। প্রতিবন্ধী সোমাইয়াকে দেখা শোনার কেউ না থাকায় গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে দেন।
আব্দুর সাত্তারের বাড়ি ভিটির জমি ছাড়া আর কোনো সম্পদ নেই। ঘর ভাড়া নিয়ে ছোট একটি রাইস মিল চালিয়ে আব্দুর সাত্তার পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছেন। রাইস মিল বোরো ও আমন মওসুমে ধান ভাঙার কাজ থাকলেও অন্য সময় বেকার সময় কাটাতে হয় আব্দুস সাত্তারকে।
দারিদ্রের কাছে হার না মানা হাফসা শিশুকাল থেকে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে বগাজান গ্রামের এনজিওদের প্রতিষ্ঠান এডুকো শিক্ষালয় থেকে ২০১৫ সালে পিএসসি, লোহাবৈ আব্দুল হেকিম সরকার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জেএসসি ২০১৮, এসএসসি-২০২১ ও এইচএসসি ২০২৩ সালে এসএসসিসহ তিনটি পরীক্ষাতেই গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েছে। এসএসসি পরীক্ষায় ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ষষ্ঠ স্থান দখল করে স্কলারশিপ পেয়েছে। এছাড়াও পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছিল।
হাফসা আক্তার জানান, বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় সরকারিভাবে প্রাপ্ত বই ও শিক্ষকদের সহযোগিতা নিয়ে লেখাপড়া করেছে। বিনাবেতনে শিক্ষকগণ তাকে প্রাইভেট পড়িয়েছেন। বাবা একজন রাইস মিল চালক সেখানে থেকে যে টাকা উপার্জন হতো তা দিয়ে সংসার চালিয়ে পড়ালেখার খরচ চালাতে পাড়তেন না। বৃত্তি, এসএসসিতে স্কালারশিপের টাকায় পড়ালেখার খরচ চালিয়েছে।
এসএসসি পর্যন্ত বিজ্ঞান বিভাগে পড়ালেখা করলেও পরবর্তীতে অর্থাভাবে হাফসা এইচএসসিতে ময়মনসিংহ মুমিনুন্নিছা সরকারি মহিলা কলেজে মানবিক শাখায় ভর্তি হয়। কলেজে পড়ালেখা করার জন্য মেসে থেকে নিজে দুটি প্রাইভেট পড়িয়ে, টিউশন ফি, বৃত্তির টাকা ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় নিজের পড়ালেখা চালিয়েছে। টাকার অভাবে তার বাবা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে তাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাতে রাজি না হয়ে সে বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে এখনো পর্যন্ত সংগ্রাম করে যাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও পড়াশোনার খরচ চালানো তার বাবার জন্য অসাধ্য হয়ে পড়ে সে টাকা জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফরম ক্রয় করতে পারেনি। কয়েকজনের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে মাত্র ৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার ফরম ক্রয় করে।
হাফসা আক্তার জানায়, সে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশের জন্য কিছু করতে চায়।
লোহাবৈ আব্দুল হেকিম সরকার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতিকুর রহমান জানান, হাফসা আক্তার খুবই মেধাবী, পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে। আমার ৩৪ বছরের শিক্ষকতায় জীবনে একজন মেধাবী শিক্ষার্থী পেয়েছি যে দেশ ও জাতীর জন্য কিছু উন্নয়ন করতে পারবে।