পাবনায় হত্যা মামলার তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে আমিনপুর থানা পুলিশের বিরুদ্ধে। পুলিশের অবহেলা এবং প্রত্যক্ষ ইন্ধনে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে অভিযোগ করে ভুক্তভোগী পরিবার নিরপেক্ষ তদন্তের পুলিশ মহাপরিদর্শক বরাবর আবেদন করেছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে পুলিশের দাবী যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই মামলার কার্যক্রম চলছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, আমিনপুর থানার আহম্মদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণচর গ্রামের মাছেম মীরের সঙ্গে জমি নিয়ে একই গ্রামের তোফাজ্জল খানের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। গত ১৫ নভেম্বর বিকেলে এ নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তোফাজ্জল সহযোগীদের সাথে নিয়ে মাছেম মীরকে পেটাতে শুরু করেন। এতে গুরুতর আহত মাছেম মীর (৫৫) বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর মারা যান।
মাছেম মীরকে হত্যার খবর পেয়ে স্থানীয়রা ঘটনাস্থল থেকে তোফাজ্জল, গোলাপী ও তানিয়াকে আটক করে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে। পরে রাতে এই ঘটনায় নিহতের বড় ভাই হাসেম মীর বাদী হয়ে আটক তিনজনসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আরো অজ্ঞাতনামাদের বিরুদ্ধে আমিনপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
তবে পুলিশ আটককৃতদের হত্যা মামলায় গ্রেফতার না দেখিয়ে পরদিন (১৬ নভেম্বর) ৫৪ ধারায় সন্দেহভাজন হিসেবে আদালতে সোপর্দ করেন। মামলার নথি পর্যালোচনায় পাবনা জজ কোর্টের আইনজীবী মো. রফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে, পুলিশের প্রত্যক্ষ ইন্ধন ও অবহেলার কারণেই আসামিরা মাছেম মীরকে হত্যার সুযোগ পেয়েছে বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের।
নিহতের ভাতিজা ফারুক মীর বলেন, আমার চাচার হত্যাকারী তোফাজ্জল খানের দায়ের করা মিথ্যা মামলায় ১৫ নভেম্বর সকালে আমার পিতা শুকুর মীর ও ভগ্নীপতি বাচ্চু শেখকে পুলিশ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর পুলিশের অপর একটি দল আমাদের বাড়িতে এলে ভয়ে আমরা পালানোর চেষ্টা করি। এই সুযোগে তোফাজ্জল দলবল নিয়ে আমাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে আমার চাচা মাছেম মীরকে পিটিয়ে হত্যা করে।
নিহতের বড় ভাই হাসেম মীর জানান, ঘটনার দিন রাতেই থানায় এজাহার দায়ের করলেও পরদিন মামলাটি রুজু হয়। হত্যাকাণ্ডের পর হাতেনাতে প্রতিবেশীরা তোফাজ্জল, গোলাপী ও তানিয়াকে আটক করে পুলিশে দিলেও অজ্ঞাত কারণে পুলিশ তাদের হত্যা মামলায় গ্রেফতার না দেখিয়ে সময় ক্ষেপণ করছেন। নিহতের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সুরতহাল রিপোর্টে তা উল্লেখ করেনি।
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আব্দুল গাফফার বলেন, নিহতের শরীরে আঘাতের কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মাছেম মীর কিভাবে মারা গেছেন, তা আমরা নিশ্চিত নই। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট না পাওয়ায় আসামিদের হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়নি।
গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে আমিনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই নিহতের ভাইসহ দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তোফাজ্জল ও তার লোকজনের হামলার ঘটনার সাথে এই গ্রেফতারের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। পুলিশ নিরপেক্ষভাবে মামলাটি তদন্ত করছে।
অন্য মামলায় আটক থাকলেও হত্যা মামলার এজাহার নামীয় হলে আসামিকে অবশ্যই হত্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে মত দিয়েছেন একাধিক আইনজীবী।
পাবনা জজ কোর্টের আইনজীবী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, নিয়মিত হত্যা মামলা রুজু হলে এজাহারে নামীয় আসামিদের সন্দেহভাজন হিসেবে আদালতে সোপর্দ করা প্রচলিত আইন পরিপন্থী। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রাপ্তির অপেক্ষায় মামলার আসামি গ্রেফতার ও তদন্ত কার্যক্রম থেমে থাকতে পারে না। এটি নজিরবিহীন ঘটনা এবং আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও দাবী তার।
এদিকে, হত্যাকারীদের সাথে পুলিশের যোগসাজশের অভিযোগ এনে ন্যায় বিচার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবীতে পুলিশ মহাপরিদর্শক বরাবর লিখিত আবেদন করেছেন নিহতের পরিবার।