শেরপুর প্রতিনিধি: ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ছুটিতে থাকায়, অদক্ষ এক প্রকল্প কর্মীর দেয়া ছাড়পত্রে চলছে পশু জবাই। সম্প্রতি ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে এসব উল্লেখ করে লিখিত অভিযোগ করেছেন ভোক্তারা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিন ঈদের ছুটিতে থাকায় তার অবর্তমানে পূর্বে স্বাক্ষরিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ছাড়পত্র টাকার বিনিময়ে সরবরাহ করে আসছেন অদক্ষ প্রকল্প কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন। এই ঘটনায় ভোক্তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গত মঙ্গলবার লিখিত অভিযোগ করেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিন গত ৮ জুলাই ঈদের ছুটিতে কার্যালয় ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে তিনি যোগদানের আগ পর্যন্ত প্রতিদিন টাকার বিনিময়ে প্রকল্পের কর্মী ইসমাইল হোসেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিনের আগের স্বাক্ষরিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ছাড়পত্র প্রদান করেন। প্রতি ছাড়পত্র প্রদানের জন্য পশু প্রতি নেয়া হচ্ছে একশ থেকে ৩শ’ টাকা পর্যন্ত। একজন নন টেকনিশিয়ান ও অদক্ষ প্রকল্প কর্মীর এই কার্যক্রমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্রেতারা।
এর আগে কুরবানির পশুর হাটে সরকারি বিধি অমান্য করে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় টাকা আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে প্রকল্প কর্মী ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে। এ বিষয় নিয়েও ওই সময় অভিযোগ করা হলে, অভিযুক্ত কর্মীর বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা না নিয়ে দপ্তরের অন্য দুইজন কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিন।
ভোক্তাদের দেয়া অভিযোগে আরও বলা হয়, সাদিয়া আফরিন স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রকল্প কর্মীর কাছ থেকে প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা গ্রহণ করায়, এ বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেননি কর্তৃপক্ষ।
এদিকে ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিনের যোগসাজসে অফিস সহায়ক (পিওন) মেহেদী হাসান ও প্রকল্পের কর্মী ইসমাইল হাসানের অনিয়মের তথ্য মিলেছে অনুসন্ধানে। একজন অফিস সহায়ক হয়েও পুরো উপজেলাতে বিনামূল্যে ভ্যাক্সিন কার্যক্রমে নিয়মিত অর্থ আদায় করেন মেহেদী হাসান। নিজের ভাই ও পরিচিতদের দিয়ে নিয়মিত পল্লী চিকিৎসকের কাজও করান মেহেদি। গত দুই বছরে মেহেদি ও তার সঙ্গীদের ভুল চিকিৎসায় পশুর মৃত্যু ও অপচিকিৎসায় আরও অসুস্থ হবার ঘটনাও রয়েছে। এ বিষয়ে একাধিকবার কার্যালয়ে মৌখিক অভিযোগ করেও কোনও সমাধান পাননি ভুক্তভোগীরা। উল্টো অপচিকিৎসায় মৃত পশুর মালিককে কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে মুচলেকা দিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দিয়েছেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিন নিজেই।
একই দপ্তরে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, অফিসটি এখন দুইটি দলে বিভক্ত। যারা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিনের কথামতো সব অন্যায় মেনে নেয়, তারা বিভিন্নভাবে অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে। বাকীদের জন্য কঠিন নিয়ম আর নিয়মের বেড়াজাল তৈরি করেছেন সাদিয়া আফরিন।
তিনি বলেন, একজন প্রকল্প কর্মকর্তা কোনোভাবে একটি উপজেলার সদর বাজারে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে পারেন না। কারণ তিনি এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত নন। দপ্তরে প্রশিক্ষিত কর্মকর্তা না থাকলে, সেটা ভিন্ন বিষয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কর্মকর্তা বলেন, অফিস সহায়ক মেহেদি নিয়ম বহির্ভূত নিয়মিত বাইরে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সাদিয়া আফরিনের স্বামী একই দপ্তরে কর্মরত থাকা অবস্থায় এ বিষয়ে একাধিকবার অভিযোগ এলেও বিষয়টি নিয়ে কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আমরা এসব নিয়ে অফিসিয়ালি কিছু বলতে গেলে চাকুরিচ্যুত ও বদলির ভয় দেখানো হয়। অফিস সহায়ক মেহেদি ও প্রকল্প কর্মী ইসমাইলের কাছ থেকে এসব করে ম্যাডাম প্রতি মাসে মাসোয়ারা নেন। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয় না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের তথ্যমতে, ঝিনাইগাতী উপজেলা সদর বাজারে প্রতিদিন ৫-১০টি গরু ও ছাগল জবাই হয়ে থাকে। শুক্রবার বা সরকারি ছুটির দিনগুলোতে এর সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি পশু জবাইয়ের আগে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার নির্ধারিত প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান এই পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে ছাড়পত্র প্রদানের পর পশু জবাই করার কথা। কিন্তু একজন অদক্ষ প্রকল্প কর্মীর মাধ্যমে প্রতিদিন স্বাস্থ্য পরীক্ষার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ক্রেতারা। আস্থা হারাচ্ছেন স্থানীয় মাংসের বাজার থেকে।
ক্রেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রশিক্ষিত জনবল না থাকলে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নিজে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারতেন। একজন অদক্ষ কর্মীকে দিয়ে এই স্বাস্থ্য পরীক্ষার ভুল হলে, আমাদের পরিবার ও সন্তানেরা অসুস্থ হলে এর দায় কে নেবে?
ঝিনাইগাতী উপজেলার বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম ও জয়নাল আবেদীন বলেন, পশু অসুস্থ নাকি সুস্থ ছিল, আমরা তা জানি না। নিয়ম অনুযায়ী পশু জবাইয়ের আগে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ছাড়পত্র ও জবাই করা পশুর মাংসে সিল দেবেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কারণে মানুষ মরা পশুর মাংস নাকি রোগে আক্রান্ত মাংস খাচ্ছেন, তা বোঝার কোনও উপায় নেই। তারা বলেন, যদি কর্মকর্তা না থেকে থাকে তাহলে দ্রুত এই পদে লোক জনবল বাড়ানো উচিৎ।
এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিন বলেন, “প্রকল্প কর্মী ইসমাইল হোসেনকে কশাইখানার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তাই তাকে এই দায়িত্ব দেয়া হয়েছে”।
এদিকে অফিস সহায়ক মেহেদি হাসানের চিকিৎসার বিষয়ে তিনি বলেন, আমার দপ্তরে কর্মকর্তা সঙ্কট, তাই পিওনকে দিয়েই ড্রেসিংয়ের কাজ করাই। আর বাইরে গেলেও সে আমার কনসার্নেই কাজ করে। দ্রুত মেহেদি প্রমোশন পেলে এ সমস্যা আর থাকবে না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রকল্প কর্মী ইসমাইল হোসেনের জব ডেসক্রিপশনে কশাই খানার বিষয়টি উল্লেখ আছে। তবে বক্তব্য গ্রহণের পরবর্তী তিন দিনেও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিন প্রকল্প কর্মী ইসমাইল হোসেনের জব ডেসক্রিপশন সরবরাহ করতে পারেননি।
পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য অর্থ আদায়ের বিষয়ে তিনি বলেন, “পশু প্রতি ইসমাইল হোসেনকে স্থানীয় কসাইরা একশ থেকে দেড়শ টাকা দিয়ে থাকে।”
এদিকে অভিযোগ পাওয়ার পর ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আল মাসুদ বলেন, আমি অভিযোগ পেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাকে মুঠোফোনে অবগত করি। তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। পরবর্তী আইন শৃঙ্খলা মিটিংয়ে আমি উনাকে উপস্থিত থাকতে বলেছি। সেখানেই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এছাড়া অদক্ষ কর্মীকে দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পশু জবাইয়ের ছাড়পত্র প্রদানের ঘটনাটি অবশ্যই নিন্দনীয়।