বগুড়ায় তাঁত বস্ত্র কুটির শিল্প ও পণ্য মেলায় লটারির নামে চলছে অবাধে জুয়া খেলার মহোৎসব। জেলার সাধারণ মানুষের লোভে ফেলে মেলার কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে খেলছেন এ জুয়া। লটারির টিকিট বিক্রি করে প্রতিদিন জেলার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। গুটি কয়েক মানুষ লটারিতে পুরস্কার জিতে লাভবান হলেও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন অধিকাংশ ব্যক্তিই।
নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই নির্বিঘ্নে মেলার আয়োজকরা লটারির টিকিট বিক্রি করছেন জেলা জুড়ে। যে কারণে এখনও পর্যন্ত প্রশাসন থেকে কোনো কার্যকরি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
গত ২৩ মে বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতাল মাঠে মনিপুরি জামদানি বেনারশি তাঁতি যান ফাউন্ডেশনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এবং বগুড়া মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন, বগুড়া কালেক্টরেট কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেড ও বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী পরিষদ জেলা প্রশাসক কার্যালয় বগুড়ার আয়োজনে মাসব্যাপী এই মেলা শুরু হয়। এরপর দিন থেকেই টিকিটের বান্ডিল আর টিকিটের কাটা অংশ সংগ্রহের জন্য প্রায় তিনশ’ বক্স নিয়ে মেলা আয়োজক কমিটির লোকজন বেরিয়ে পরে। এরপর শহরের মোড়ে মোড়ে চেয়ার টেবিল বসিয়ে এবং উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে অটোরিকশা ঘুরে ঘুরে মেলার চকটদার বিজ্ঞাপন শুনিয়ে ২০ টাকা মূল্যের টিকিট বিক্রি শুরু করে দেন। সারাদিন টিকিট বিক্রি শেষে রাত সাড়ে ১০টায় মেলা চত্বরে লটারি ড্র অনুষ্ঠিত হয়। ড্র অনুষ্ঠানটি সরাসরি ক্যাবল টিভিতে সম্প্রচার করা হয়। প্রতিদিন এফজেড, পালসারসহ বেশ কয়েকটি মোটর সাইকেল, ফ্রিজ, স্বর্ণালংকারসহ আকর্ষণীয় পুরস্কারের তালিকায় রাখা হয়। ফলে দামি এসব পণ্য কিনতে পারবে না এমন শ্রেণির লোকজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ দিনে ২শ-৩শ’ টাকায় খরচ করে প্রতিদিন ১৫-২০টি করে টিকিট কিনছেন পুরস্কার জেতার আশায়।
সরেজমিনে মেলাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, মেলার টিকিট কাউন্টারে কোনো ভিড় নেই। তবে মেলার দরজার দু-পাশে চেয়ার-টেবিল বসিয়ে সেখানে বিক্রি করা হচ্ছে টিকিট। আর সেখানেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ। এছাড়া মেলার ভেতরেও অল্প দূরত্বে চেয়ার টেবিল বসিয়ে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়েছে। শহরের সাতমাথা, তিনমাথা, কাঠালতলা, জলেশ্বরী, চারমাথা, খান্দারসহ বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে একইভাবে মেলার অস্থায়ী টিকিট কাউন্টার। এছাড়া ব্যাটারি চালিত অটোরিকশায় মাইক লাগিয়ে পুরো শহর এবং উপজেলা থেকে গ্রাম পর্যায়ে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করা হচ্ছে লটারির টিকিট।
শহরের তিনমাথা এলাকার নাদের হোসেন বলেন, তিনি প্রতিদিনই ১শ’ টাকা দিয়ে ৫টা করে টিকিট কেনেন। যদি ৩-৪ হাজার টাকা খরচ করে একটা মোটর সাইকেল পাওয়া যায় এমন আশা থেকেই তিনি এভাবে টিকিট কেটে যাচ্ছেন। যদিও একবারও তিনি কোন পুরস্কার পাননি। তিনি বলেন, তার ভাগ্যটাই খারাপ। এরপরেও তিনি কেটে যাচ্ছেন। যদি ভাগ্যে লেগে যায়।
মালগ্রাম চাপড়পাড়া এলাকার রিকশা চালক আজিম উদ্দিন। তিনিও প্রতিদিন ৫/৭ করে টিকিট কাটেন। তিনি বলেন, পুরস্কার তো অনেকগুলো। প্রতিদিন কেউ না কেউ তো পুরস্কার পাচ্ছেই। যে কারণে তিনিও কাটছেন। তিনিও হয়তো পাবেন। তবে এ পর্যন্ত তিনি ২ হাজার টাকার বেশি লটারির টিকিট কিনেছেন।
এ বিষয়ে কথা বলতে মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও মনিপুরি জামদানি বেনারশি তাঁতি কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক আমির হোসেনের যোগাযোগ করা যায়নি। মেলার কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। কার্যালয়ে উপস্থিত ব্যক্তিরা এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এভাবে লটারির টিকিট বিক্রির বিষয়টি জানার পর ইতোপূর্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছিলো কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থার সুযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে বগুড়া জেলা পুলিশ সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্ত্তী, যেহেতু মেলাটির আয়োজনে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কর্মচারীরাও রয়েছে সেহেতু আমরা আমরা জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অনুরোধ করেছি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। তারা ব্যবস্থা না নিলে আমরা বব্যবস্থা নেবো।
এ বিষয়ে কথা বলতে বগুড়া জেলা প্রশাসক জিয়াউল হক এর মোবাইলে একাধিকবার কল দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে, তাঁতবস্ত্র মেলার লটারির টিকিট বিক্রি চলছে পুরো জেলাজুড়ে এটাকে কি বৈধতা দেয়া হয়েছে? এমন প্রশ্নে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, কোনো বৈধতা দেয়া হয়নি। এরপরও তারা কিভাবে লটারির টিকিট জেলাজুড়ে বিক্রি করছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিষয়টি জানার পর গত ১ মে থেকে তাদের এভাবে টিকিট বিক্রি করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এরপরও যদি টিকিট বিক্রি করে তবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
#ঢাকাটাইমস