প্রতিটি ক্ষেত্রের মতোই করোনা মহামারির কারণে চলতি বছরের শুরুটা ভালো হয়নি নাট্যাঙ্গনের জন্য। যদিও অনেকেই লকডাউনের সময়ও শুটিং করেছে। লকডাউনের আগেই এ বছরের জন্য নাটক নির্মাণ করেছেন অনেক নির্মাতা। এদিকে রোজার ঈদের পর থেকে আগের মতোই সরব হয়ে ওঠে নাট্যাঙ্গন। যে অবস্থা এখনো বিরাজমান। সিনেমা কিংবা গানের চাইতে তুলনামূলক নাটকের অবস্থা ভালো গেছে এ বছর। লকডাউন বাদ দিলে বছরজুড়েই সরব ছিল এ অঙ্গন। গল্পনির্ভর নাটকগুলোই এবার দর্শক টেনেছে বেশি।
তবে টিভি চ্যানেলের বাইরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক এবার প্রকাশ হয়েছে ইউটিউবে। সংগীতের প্রযোজকরাও এ বছর নাটক প্রযোজনায় ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। নাটকের শীর্ষ তারকা মোশররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, আফরান নিশো, মেহজাবিন চৌধুরী, তানজিন তিশা, তৌসিফ মাহবুব, জোভান, মুশফিক আর ফারহান, তাসনিয়া ফারিণ, জিয়াউল হক পলাশরা ব্যাপক ব্যস্ত সময় পার করেছেন নাটকে। টিভি নাটকের সংগঠনগুলো এ বছরও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে বছরজুড়ে। বিশেষ করে তাহসান, মিথিলা ও শবনম ফারিয়ার বিরুদ্ধে ইভ্যালি কাণ্ডের জেরে এক গ্রাহকের মামলা হলে নাটকের সংগঠনগুলো তার প্রতিবাদ জানায়, যা ছিল প্রশংসনীয়।
নাটকের গল্পের বাঁকবদল: গত বছর পর্যন্ত খণ্ড কিংবা ধারাবাহিক নাটকের ক্ষেত্রে অনেকটাই কম শিল্পী নিয়ে নাটক নির্মাণের হিড়িক দেখা গেছে। কয়েকজন শিল্পীর মধ্যেই নাটক সীমাবদ্ধ থাকায় দর্শক বেশ বিরক্ত ছিল। মা, বাবা, ভাই, বোন কিংবা পরিবারের উপস্থিতি নাটকগুলোতে কম দেখা গেছে। পরিবারনির্ভর গল্পের নাটকের সংখ্যা কমেছিল। তবে এ বছর আবার ফিরে এসেছে পরিবারকেন্দ্রিক গল্পের নাটকের সংখ্যা। পাশাপাশি গতানুগতিক রোমান্টিক নাটকের পরিবর্তে গল্পনির্ভর ও ভিন্নধর্মী নির্মাণের নাটকগুলোকেই দর্শক গ্রহণ করেছেন বেশি। এক্ষেত্রে বেশ ক’জন পরিচালক ও প্রযোজক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
দর্শকপ্রিয় তিন ধারাবাহিক: এনটিভিতে প্রচারিত মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের ‘ফ্যামিলি ক্রাইসিস’ ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে। বিশেষ করে পরিবারভিত্তিক নাটকের সূচনা এ নাটকের মাধ্যমে আবার হয়েছে এ বছর। এ নাটকে অভিনয় করেছেন শর্মিলী আহমেদ, শহীদুজ্জামান সেলিম, রুনা খান, সোহেল খান, মনিরা মিঠু, শামীম হাসান সরকার, সারিকা সাবাহ, শবনম ফারিয়া, তামিম মৃধা, জিয়াউল হক পলাশ, অনিক প্রমুখ। চলতি বছর পারিবারিক ঘটনা ও ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে দিপ্ত টিভির ধারাবাহিক ‘মাশরাফি জুনিয়র’ ছিল দর্শকপ্রিয়তায়। সাজ্জাদ সুমনের পরিচালনায় এ নাটকে অভিনয় করেন ফজলুর রহমান বাবু, লুৎফর রহমান জর্জ, ড. এজাজ, চিত্রলেখা গুহ, শতাব্দী ওয়াদুদ, গোলাম ফরিদা ছন্দা, সাফানা নমনী প্রমুখ। অন্যদিকে ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট সিজন থ্রী’ নাটকটির তৃতীয় মৌসুম শেষ হয় এ বছর। এ নাটকটি ধ্রুব টিভিতে প্রচার হয়ে আগের সিজনগুলোর মতোই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কাজল আরেফীন অমি পরিচালিত এ নাটকে অভিনয় করেন মিশু সাব্বির, মারজুক রাসেল, চাষী আলম, জিয়াউল হক পলাশ প্রমুখ।
দর্শকপ্রিয় খণ্ড নাটক: এ বছর বেশকিছু খণ্ড নাটকই আলোচনায় এসেছে। এরমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে হানিফ সংকেতের ‘সৎ এর সত্য সমাচার’, ভিকি জাহেদের ‘পুনর্জন্ম, মাবরুর রশীদ বান্নাহ’র ‘মায়ের ডাক’ ও ‘সুইপারম্যান, মাহিদুল মহিমের ‘শিল্পী’, মাহমুদুর রহমান হিমির ‘আলো’, সকাল আহমেদের ‘গরম ভাতের গন্ধ’, সাগর জাহানের ‘শেষটা অন্যরকম ছিল’, মাহমুদ মাহিনের ‘পাগল তোর জন্য’, মিজানুর রহমান আরিয়ানের ‘তাকে ভালোবাসা বলে’ ও ‘যদি কোনো দিন’, কাজল আরেফিন অমির ‘আপন’ প্রভৃতি।
আলো ছড়িয়েছেন যারা: এ বছর সিনিয়র অভিনয়শিল্পীদের পাশাপাশি আলো ছড়িয়েছেন চলতি প্রজন্মের তারকারাও। মোশাররফ করিম অভিনীত ‘গরম ভাতের গন্ধ’, ‘যমজ’ ও ‘শেষটা অন্যরকম ছিল’, আফরান নিশোর ‘শিল্পী’ ‘পুনর্জন্ম’, ‘চিরকাল’, জিয়াউল ফারুক অপূর্ব’র ‘যদি কোনোদিন’ ও ‘শনির দশা’, তাহসানের ‘কমলা রঙের রোদ’, ‘মেহজাবিন চৌধুরীর ‘আলো’, ‘চিরকাল আজ’ ও পুনর্জন্ম, তানজিন তিশার ‘এক মুঠো প্রেম’ ও ‘শেষটা অন্যরকম ছিল’, তৌসিফের ‘চিরকাল’, জোভানের ‘দিস ইজ ওয়াইফ’, সাবিলা নূরের ‘ক্যান্ডি ক্রাশ’ এবং মিশু সাব্বির ও জিয়াউল হক পলাশ ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’ ও ‘ফিমেল’ নাটকের মাধ্যমে আলো ছড়িয়েছেন।
ব্যতিক্রমী ফারহান: চলতি বছর সব থেকে ব্যতিক্রমী চরিত্রগুলোতে অভিনয় করে বছরজুড়ে আলোচনায় ছিলেন মেধাবী অভিনেতা মুশফিক আর ফারহান। ‘সুইপারম্যান’ নাটকে সুইপার চরিত্রে অভিনয় করে তাক লাগিয়েছেন তিনি। এছাড়াও ‘পাগল তোর জন্য’, ‘ইমোশনাল ম্যান’, ‘আরজে’, ‘ক্রাইম পার্টনার’ চরিত্রে অভিনয় করে আলোচিত ছিলেন তিনি।
কেয়া পায়েলের উত্থান: গত বছর থেকেই সম্ভাবনার জানান দিলেও অভিনেত্রী কেয়া পায়েল চলতি বছর ছিলেন ব্যস্ততা ও সফলতায় সমসাময়িক অনেকের চাইতে এগিয়ে। হাল সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবিন চৌধুরী ও তানজিন তিশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পায়েলের উত্থান ছিল চোখে পড়ার মতো। তার অভিনীত ‘পাগল তোর জন্য’, ‘কি কারণে’, ‘ডন’, ‘শুভ+নীলা’, ‘আই সি ইউ’, ‘হঠাৎ এলো বৃষ্টি’ নাটকগুলোতে পায়েলের অভিন ছিল প্রশংসিত।
আলোচিত পরিচালক: ‘মায়ের ডাক’ ও ‘সুইপারম্যান’ এর মতো ব্যতিক্রমী নাটক বানিয়ে আলোচনায় ছিলেন নির্মাতা মাবরুর রশীদ বান্নাহ। অন্যদিকে ‘ব্যাচেলর পয়েন্ট’, ‘ফিমেল’ ও ‘আপন’ নাটক নির্মাণ করে কাজল আরেফীন অমি ছিলেন সফল। ভিন্নধর্মী নাটক ‘পুনর্জন্ম’ পরিচালনা করে প্রশংসিত হয়েছেন ভিকি জাহেদ। এছাড়াও পরিচালকদের মধ্যে সকাল আহমেদ, সাগর জাহান, মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ, মিজানুর রহমান আরিয়ান, মহিদুল মহিম, মাহমুদুর রহমান হিমি, মাহমুদ মাহিনসহ বেশ ক’জন পরিচালক আলো ছড়িয়েছেন নিজেদের নির্মাণে।