স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেছেন, সবার জন্য বাস উপোযোগী দৃষ্টিনন্দন ঢাকা গড়ে তুলতে সকলকে একসাথে কাজ করতে হবে। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সকল শ্রেণীর মানুষ ঢাকায় বসবাস করে। তাই সবার বিষয়কে বিবেচনায় রেখেই ঢাকাকে গড়ে তুলতে হবে।
বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘নগর কথা’- নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন ও নাগরিক সুবিধাসমূহ: প্রেক্ষিত ঢাকা’ বিষয়ক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
ওয়াল্ড ভিশন বাংলাদেশ, সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজ, ইউএন-হ্যাবিট্যাট এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন প্রকল্প যৌথভাবে এই আয়োজন করে।
এলজিআরডি মন্ত্রী বলেন, যেকোন শহরেই সকল শ্রেণীর মানুষের প্রয়োজন রয়েছে। একইভাবে রাজধানী ঢাকায়ও সকল শ্রেণীর মানুষের প্রয়োজন রয়েছে। তাই সকল শ্রেণির মানুষের জন্য সুন্দর ও নিরাপদ জীবন যাপনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ঢাকায় শ্রেণিভেদে মানুষের আয়ের তারতম্য রয়েছে। পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য ইউটিলিটি সার্ভিসের মূল্য নির্ধারণে মানুষের আয়ের বিষয়কে বিবেচনায় রাখতে হবে। একজন্য জোনভিত্তিক পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য ইউটিলিটি সার্ভিসের দাম নির্ধারণ করা যৌক্তিক।
তিনি বলেন, গুলশান, বারিধারা, বনানীসহ অভিজাত এলাকায় বসবাসরত মানুষ যে নাগরিক সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন যাত্রাবাড়ি অথবা পুরান ঢাকার মানুষ তা পায় না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সমতাভিত্তিক উন্নয়নের কথা বলেছেন। সমাজ ও মানুষের মধ্যে বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত করার জন্য বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করেননি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, ঢাকা শহরে উন্মুক্ত স্থান ও গাছপালা ধ্বংস করে একের পর এক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। নগরে অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা করা হচ্ছে। এগুলো কেন করা হচ্ছে, কার পরামর্শে হচ্ছে? সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। এখন সময় এসেছে নগরে ভবন নির্মাণ করতে গেলে অবশ্যই সিটি করপোরেশনের অনুমতি নিতে হবে। সবুজ এলাকা ও উন্মুক্ত স্থান ধ্বংস করে কিছু করতে দেওয়া হবে না। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা ভাবতে হবে।
তিনি বলেন, এয়ারপোর্ট সড়কে বনানী চেয়ারম্যান বাড়ীর সামনে সিটি ফরেস্ট ছিল, সেটা ধ্বংস করে কেন সেতু ভবন করা হয়েছে। সেতু ভবনের পাশে আবার বিআরটিএ ভবন করা হয়েছে। কিছুদিন আগে আবারও গাছপালা কেটে ভবন নির্মাণ করতে গেলে আমি বন্ধ করে দেই। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের-ড্যাপের মধ্যে এবং নগর পরিকল্পনায় এই জায়গা গুলোতে যদি সিটি ফরেস্ট থাকে তাহলে ভবন ভাঙতে হবে। নগরের প্রয়োজনে, জনগনের স্বার্থে যেকোনো ভবন ভাঙতে হবে।
সব বিভাগের সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে উল্লেখ করে ডিএনসিসি মেয়র বলেন, যেকোনো কাজ দেশের স্বার্থে ও দশের স্বার্থে হলে আমি আপনাদের সঙ্গে যোগ দেবো। যদি নিজের স্বার্থে হয় তাহলে আমি আপনাদের সঙ্গে নেই। সুন্দর নগরায়ন করতে গেলে সবাইকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে। মিরপুর প্যারিস রোড সংলগ্ন মাঠটি প্লট আকারে কিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হলো? ষাটের দশকে মাস্টার প্লানে ও ১৯৮৭ সালের ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটির লেআউটেও এটি উন্মুক্ত স্থান হিসেবে দেখানো আছে। ড্যাপের নকশায়ও এটি উন্মুক্ত স্থান হিসেবে রয়েছে। এখানে কিছুতেই প্লট হতে পারে না। এসময় তিনি বর্তমান জলবায়ুর উদাহরণ টেনে বলেন, আমরা পরিবেশ ধ্বংশ করেছি। এখন পরিবেশ সেই ধ্বংশের প্রতিশোধ নিচ্ছে।
খাল উদ্ধার ও নদী বাঁচাতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকার নদী বাঁচাতে হবে আর নদী বাচাতে হলে খাল খনন করতে হবে। ঢাকার খালকে বাঁচাতে হলে সিএস দাগের মাধ্যমে সীমানা নির্ধারন করতে হবে। মহানগর জরিপ অনুসরণ করলে শহরকে বাঁচানো যাবে না। কল্যাণপুর রিটেনশন পন্ড দখল হয়ে গেছে। এগুলো উদ্ধারে আমরা কাজ করছি। খাল উদ্ধারে সীমানা পিলার লাগানো শুরু করেছি। দিন দিন তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। গাছ লাগাতে হবে। নগরবাসীকে ছাদবাগান করতে উৎসাহিত করছি। ছাদবাগান করলে ১০ ভাগ ট্যাক্স রিবেট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এই ফাইলটি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। আশা করি দ্রুততই অনুমোদন হয়ে যাবে।
নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সিটি কর্পোরেশন কাজ করছে উল্লেখ করে মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, হকারদের নগরের অংশ হিসেবে চিন্তা করে স্মার্ট ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার জন্য মিরপুর দশ নম্বরে পাইলট প্রকল্প নিয়েছি। সপ্তাহে পাঁচ দিন নির্দিষ্ট হকাররা বিকাল ৪টার পর থেকে ফুটপাতে বসছে। অন্য সময় ফুটপাতে কোন হকার বসতে পারবে না। পর্যায়ক্রমে পুরো এলাকায় এটি চালু করা হবে। হলিডে মার্কেট ও ইভিনিং মার্কেট করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্য বক্তারা বলেন, ঢাকা শহরে নিম্ন আয়ের মানুষ তুলনামূলকভাবে মধ্য আয়ের তুলনায় দ্বিগুণ বাড়ি ভাড়া দেন। নিম্ন আয়ের ক্ষেত্রে ১০০ বর্গফুট বাসার ভাড়া পড়ে চার হাজার টাকা। অন্যদিকে মধ্য আয়ের নাগরিকরা ১ হাজার ৫০০ বর্গফুট বাসার ভাড়া দেন ৩০ হাজার টাকা। ঢাকায় নিম্ন আয়ের মানুষ কর্মের তাগিদে জড়ো হন। কিন্তু তাদের আবাসন সুবিধা খুব বেশি নয়। বিশেষ করে বস্তি এলাকায় বাসস্থানের জন্য যে মানমাত্রা থাকা দরকার সেখানে তা নেই। অথচ নিম্ন আয়ের মানুষ অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছেন।
এলজিআরডি মন্ত্রী এই অনুষ্ঠানে ডিএনসিসি মেয়রকে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিস অ্যাওয়ার্ড-২০২২ অর্জন করায় অভিনন্দন জানান। এই অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন-ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা, মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডিএনসিসির প্রধান পরিকল্পনাবিদ মাকসু হাসেম।
অন্যান্যের মধ্যে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, সেন্টার অফ আরবান স্টাডিজের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম প্রমুখ।