একটি সেতুর অভাবে মানিকগঞ্জের লাখো মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন যুগের পর যুগ। একদিকে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের কষ্ট, অন্যদিকে উৎপাদিত কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েন অসুস্থরা।
এছাড়া সময়মত স্কুল-কলেজে পৌঁছাতে ভোগান্তিতে পড়তে হয় শিক্ষক শিক্ষার্থীদের। ধলেশ্বরী নদীর দশআনী ঘাটে সেতু নির্মাণ হলে দুর্ভোগের অবসান হবে বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের দশআনী ঘাট। সেতু না থাকায় প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে পার হন হাজারো মানুষ। কৃষ্ণপুর, আটিগ্রাম ও বায়রা ইউনিয়নের ৬০ থেকে ৬৫টি গ্রামের লাখো মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছোট একটি নৌকা। চাকরি, লেখাপড়া, ব্যবসা-বাণিজ্য ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে নদী পার হয়ে জেলা সদরে আসতে হয় তাদের। এলাকাবাসীর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে সেতু নির্মাণের আশ্বাস পেলেও পূরণ হয়নি তাদের দাবি।
রাজিবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া স্কুল ছাত্রী সোনিয়া রহমান জানান, ‘এখনতো প্রতিদিনই সকালে বৃষ্টি হচ্ছে। আমার বাড়ি মকিমপুর গ্রামে। এই খেয়া পার হয়েই স্কুল ও প্রাইভেট পড়তে যেতে হয়। সকাল বেলা অনেক চাপ থাকে এই ঘাটে। একটু দেরি হয়ে গেলেই ২০/৩০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। আর ছোট একটি নৌকার মধ্যে মোটরসাইকেল, সাইকেলসহ এত মানুষ উঠে। পার হবার সময় শুধু মনে হয় কখন বুঝি নৌকাটা ডুবে যায়। আমার স্কুল জীবনে আমি নিজেই এই নৌকা থেকে দুইবার পড়ে গেছি।’
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সানোয়ার হোসেন জানান, ‘এই খেয়া পার হয়ে কৃষ্ণপুর, আটিগ্রাম ও বায়রা ইউনিয়নের সকল শ্রেণি পেশার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ যাতায়াত করেন। সকাল থেকে রাত ৮-৯ টা পর্যন্ত খেয়া পারাপার চললেও গভীর রাতে কেউ অসুস্থ হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় অসুস্থ ও গর্ভবতী মায়েদেরকে। তাই এত মানুষের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে হলেও অতিসত্বর এখানে একটা সেতু নির্মাণ করা হোক।’
কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বারাহির চর গ্রামের ৬০ বছরের সোবহান মোল্লা। তার সাথে এই প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি জানান, ‘ছোট বেলা থেকেই আমি কৃষি কাজের সাথে জড়িত। ধানের পাশাপাশি প্রায় দুই থেকে আড়াই বিঘা জমিতে সব মৌসুমেই সবজি চাষ করি। এই ইউনিয়নের প্রায় ৭০-৮০ ভাগ লোক এই কৃষি পেশার সাথে জড়িত। বিপত্তিটা হয় আমাদের উৎপাদিত শাক-সবজিগুলো বাজারজাত করার সময়। কারণ এই দশআনি খেয়া ঘাটে শুধুমাত্র ছোট একটা নৌকা দিয়ে পারাপারের কাজ করা হয়। সকালে স্কুল কলেজের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর পাশাপাশি অন্যান্য পেশার মানুষরা পার হয়। ওই সময় আমরা সময় মতো বাজারে এসব নিয়ে যেতে পারি না। আর একটা সেতু হলে এই সমস্যা থাকবে না।’
রাজিবপুর বাজারের হার্ডওয়ারের ব্যবসায়ী রহমান খাঁ জানান, ‘মানিকগঞ্জ শহর থেকে আমাদের বাজারের দূরত্ব মাত্র ১০ কিলোমিটার। আর হাইওয়ে দিয়ে ঘুরে আসলে দূরত্ব হবে প্রায় ২০ কিলোমিটারের মতো। যদি একটা সেতু থাকতো তাহলে ১৫-২০ মিনিটের মধ্যেই বাজার থেকে শহরে যাওয়া যেত। এতে করে আমাদের কষ্টের পাশাপাশি অর্থেরও অনেক সাশ্রয় হতো। শুধু ব্যবসায়ী নয় সকল শ্রেণি পেশার মানুষের জীবনমান উন্নত হতো।’
কৃষ্ণপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেলিম হোসেন বিপ্লব জানান, ‘এই দশআনি ঘাটে একটি সেতুর যে কি প্রয়োজন তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। কারণ এই ইউনিয়নের পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় দুই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এখানে সেতুটি নির্মিত হলে জেলা সদরের সাথে তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ৬০-৬৫টি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন একধাপ এগিয়ে যাবে। তাই দশআনী ঘাটে সেতু নির্মাণে প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করছি। ধলেশ্বরী নদীর উপর সেতু নির্মাণ করা হলে মানুষের ভোগান্তি কমবে বলে দাবি এই জনপ্রতিনিধির।’
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যোতিশ্বর পাল জানান, ‘ইতোমধ্যেই আমরা ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি। স্থানীয়দের ভোগান্তি লাঘবে সেতু নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আশা করি খুব শিগগির ওই এলাকায় সেতুটির নির্মাণ কাজ শুরু হবে।’
খুব শিগগির এখানে একটা সেতু নির্মাণ করে কয়েক লাখ মানুষের যাতায়াতের পথ সহজ করা হবে এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।