আশ্বিন মাস শেষের পথে। তবে এখনো কমবেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ার পরও থেমে থেমে বৃষ্টিপাত। ফলে বৃষ্টির জমানো পানি ডেঙ্গুর প্রজনন কেন্দ্র হয়ে উঠছে।
অপরদিকে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে মেঘা প্রকল্পের কাজ চলায় সেইসব স্থানে খানাখন্দে পানি জমে এডিশ মশার জন্ম হচ্ছে। এভাবে দিনকে দিন ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমার মৌসুমে উল্টো বেড়ে চলেছে। ডেঙ্গুর পরিস্থিতি ধারণ করেছে ভয়াবহ রূপ। বৃহস্পতিবারও আটজনের মৃত্যু হয়েছে ডেঙ্গুতে। এডিশ মশার কামড়ে একদিনে এতো বড় মৃত্যুর মিছিল আর দেখেনি বাংলাদেশ।
ডেঙ্গুতে প্রতিদিন যে হারে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে তার তুলনায় চিকিৎসাসেবা তেমন বেশি না থাকায় মৃত্যু থামানো যাচ্ছে না। যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. আহমেদুল কবির জানান, এখন পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালগুলোতে যত সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছেন তাদের সবাইকে সেবা দেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, বড় কোনও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়নি। তবে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে গেলে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে আলোচনা করবে স্বাস্থ্য অধিদফতর।
রাজধানীতে তিন এলাকা থেকে ডেঙ্গু রোগী বেশি আসছে বলে জানান ডা. আহমেদুল কবির। এলাকাগুলো হল-মিরপুর, উত্তরা ও মুগদা। তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকার পর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি। সেখানে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৬৮ জন।’
ডা. আহমেদুল কবির আরও জানান, ‘হাসপাতালে ভর্তির তিন দিনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৮ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ৩-৬ দিনের মধ্যে ১৮ জন, ৬-৯ দিনের মধ্যে ৬ জন এবং ৯-৩০ দিনের মধ্যে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুবরণ করছেন ৪০ থেকে ৫০ বছরের মানুষ। ডেঙ্গুতে ঢাকার বাইরেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হচ্ছে। আর এতে নারীদের মৃত্যু হার পুরুষের তুলনায় বেশি। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তিন দিনের মধ্যে ডেঙ্গুতে মারা যাচ্ছে আক্রান্তরা। ঢাকার বাইরে জেলার মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যাও কক্সবাজারে বেশি। আর ডেঙ্গুতে ঢাকার বাইরেই বেশি মৃত্যু হচ্ছে। এতে নারীদের মৃত্যুহার পুরুষের তুলনায় বেশি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু সংক্রান্ত প্রেজেন্টেশনে বলা হয়, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২২ হাজার ৫১৭ জন। যা গত বছর ছিল ২৮ হাজার ৪২৯ জন, ২০২০ সালে ছিল ১৪০৫ জন। তবে সবচেয়ে বেশি ছিল ২০১৯ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন।
ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় চলতি বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ১৬ হাজার ৭৬২ জন। ঢাকার বাইরে ৫ হাজার ৭৭৫ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা ৬৪৭ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ৪১৫ জন। ঢাকার বাইরে ২৩২ জন। ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু নারীর, ৪৬ জন, পুরুষ ২৯ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ২০১৯ সালে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৭৯, ২০২০ মৃত্যু হয় ৭ জনের। ২০২১ সালে মৃত্যু হয় ১০৫ জনের। সর্বশেষ ২০২২ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৭৫ জনের।
চিকিৎসার বিষয়ে আহমেদুল কবীর বলেন, ‘যেসব বেসরকারি হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নিচ্ছে তারা যেনও সরকারি নিয়ম মেনে রোগীদের ভর্তি করায়। কোনোভাবে রোগীকে যেন হয়রানি না করা হয়। এছাড়া তাদের ডেঙ্গু মেনেজমেন্টের জন্য রোগ সম্পর্কে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়।’
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন উদ্বেগের বিষয়। এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আমাদের অতি দ্রুত কিছু কাজ করতে হবে। আমরা যেহেতু যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি সেই হটস্পটগুলো চিহ্নিত করতে পেরেছি, ওই এলাকাগুলোতে এখন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো দরকার। ক্র্যাশ প্রোগাম বলতে আমি বলছি, ওই এলাকাগুলোতে এডিস মশা নির্মূল করার বৃহৎ কাজ। এসব কর্মসূচিতে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত মূল্যায়ন করে গবেষকদের সমন্বয়ে একটি পরিকল্পিত কর্মসূচি হাতে নিতে হবে। মশা নিধনে জাতীয়ভাবে একটি সেলও গঠন করা জরুরি।’
ক্র্যাশ প্রোগাম কিভাবে চালাতে হবে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ধরেন আমরা মিরপুরের মতো এলাকা হটস্পট বলে চিহ্নিত করেছি। এখন সেখানে এক দিন বা দুই দিনের মধ্যে সব উড়ন্ত মশা মেরে ফেলতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা যে কাজটা করতে পারি পুরো এলাকাজুড়ে অনেক বেশি পরিমাণে ফগার মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটিয়ে মশা মারতে হবে। এই এলাকায় যদি এই কার্যক্রম চালাতে ১০০টি ফগার মেশিন লাগে, তাহলে যতগুলো ঘাটতি আছে ততগুলো নিয়ে রাথতে হবে। এরপর একসাথে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। প্রয়োজনে অন্যান্য এলাকা থেকে এখানে সরঞ্জাম আনতে হবে। এছাড়া জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সবাইকে বুঝাতে হবে কারও বাড়ির আশেপাশে যেন পানি জমে না থাকে।’
‘এছাড়া দিনে বা রাতে যেকোনো সময় ঘুমাতে গেলে অবশ্যই মশারী টানিয়ে ঘুমাতে হবে। প্রয়োজনে একটা উৎসবের মতো করে এই আয়োজন করতে হবে। যেন সবাই বুঝতে পারে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এই অভিযান চলছে। তাহলে এলাকার লোকজনও সচেতন হবে’ -বলেন এই বিশেষজ্ঞ।
সারাদেশের কথা মনে করিয়ে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু কিন্তু শুধু ঢাকাতেই নয়, সারাদেশেই মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। তাই আমি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও বলব, এ বিষয়ে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিন।’
ডেঙ্গু হলেই কি হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে। ডেঙ্গু হয়েছে এটা যদি নিশ্চিত হওয়া যায়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। ডেঙ্গু হলেই যে হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে বিষয়টা এমন না। বাসায় থেকেও চিকিৎসা নেওয়া যায়। তবে অবস্থা খারাপ হলে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।’
#ঢাকাটাইমস