স্বর্ণ চোরাচালানে বাংলাদেশ পুলিশের এক কর্মকর্তা কাঠমান্ডুতে ধরা পড়ার পর নড়েচড়ে বসেছে নেপাল সরকার। ওই পুলিশ কর্মকর্তা এবং তার সহযোগী অন্য বাংলাদেশিদের জরিমানা করে ছেড়ে দিলেও কাঠমান্ডু বিষয়টি ফলোআপে রেখেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফে পুরো ঘটনার বিস্তৃত তদন্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। সেগুনবাগিচা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের সদস্যদের অপতৎপরতার বিষয়টি নেপাল সরকারের অজানা নয় কিন্তু এর সঙ্গে বাংলাদেশ পুলিশের একজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা এবং তাকে ছাড়িয়ে আনতে বিদেশ থেকে তৃতীয় কারো মোটা অঙ্কের জরিমানা পরিশোধে বিস্মিত নেপাল সরকার। তাদের আশঙ্কা এই ধারা অব্যাহত থাকলে নেপাল অচিরেই পাচারের নিরাপদ রুটে পরিণত হবে যা দেশটির অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাছাড়া এটি কেবল বাংলাদেশের নিরাপত্তায় হুমকি হবে না, তা নেপালকেও ঝুঁকিতে ফেলবে।
এ জন্য ওই বাংলাদেশি চক্রের ‘গডফাদার’কে চিহ্নিতকরণ এবং তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে নেপাল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে ঘটনার তদন্ত এবং এ বিষয়ে কোনো ছাড় না দেয়ার সুপারিশ করেছে।
কে এই পুলিশ সদস্য, কীভাবে চোরাচালানে সম্পৃক্ততা?
ঢাকা এবং কাঠমান্ডুর কর্মকর্তাদের ভাষ্য মতে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত ছিলেন এসআই মিরাজুল ইসলাম।
বিমানবন্দরে চোরাচালান ঠেকানোর দায়িত্ব ছিল তার। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি নিজেই জড়িয়ে যান স্বর্ণ পাচারের সঙ্গে। সম্প্রতি দুবাই থেকে স্বর্ণের বড় চালান নিয়ে কাঠমান্ডু হয়ে ঢাকায় ফেরার পথে ৭ সহযোগীসহ নেপালে আটক হন মিরাজুল। তার আটকের পরপরই দৃশ্যপটে আসেন পর্দার আড়ালে থাকা একাধিক ‘গডফাদার’।
মিরাজুলসহ তিনজনকে ছাড়িয়ে নিতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জরিমানার ৭৬ লাখ নেপালি রুপি নিয়ে তারা দুবাই থেকে সরাসরি কাঠমান্ডুতে হাজির হন। এরপর ৮ই জানুয়ারি তাদের মুক্ত করতে সক্ষম হন। এসআই মিরাজুলসহ অন্যরা দেশে ফিরেছেন। তারা বর্তমানে নজরদারিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ দূতাবাসের রিপোর্টে যা বলা হয়েছে-
এদিকে রিপোর্টে প্রকাশ ওই ঘটনা নিয়ে কাঠমান্ডুতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরী নেপালের অর্থমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন। এরপর ঘটনার পুরো বর্ণনা দিয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামালের কাছে চিঠি লেখেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, পররাষ্ট্র সচিব, নিরাপত্তা সেবা বিভাগের সচিব এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া অনুবিভাগের মহাপরিচালকের কাছে অনুলিপি পাঠান। সেই চিঠি মতে, নেপালের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ স্বর্ণ চোরাচালানে জড়িত থাকায় যে আটজন বাংলাদেশিকে আটক করেছে, তাদের মধ্যে কেবল এসআই মিরাজুল সরকারি পাসপোর্ট বহন করছিলেন। বাকিরা সাধারণ পাসপোর্টধারী।
আটক ব্যক্তিরা হলেন- হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের এসআই মো. মিরাজুল ইসলাম (বাংলাদেশি অফিশিয়াল পাসপোর্ট নম্বর ওসি৬০০৯০৮৩), সালমান আহমেদ (বাংলাদেশি পাসপোর্ট নম্বর বিটি০২১২১৫৪), মো. ইউনুস আলী (বাংলাদেশি পাসপোর্ট নম্বর বিকিউ০৩৯৩২৮৮), জাহিদুল ইসলাম (বাংলাদেশি পাসপোর্ট নম্বর এও০১০০৮৮৫), তৌহিদুল তানভীর (বাংলাদেশি পাসপোর্ট নম্বর এও১২৪১৪৬৯), সোবহান তালুকদার (বাংলাদেশি পাসপোর্ট নম্বর বিটি০৬৯৩৫৯৯) ও আশরাফুল ইসলাম (বাংলাদেশি পাসপোর্ট নম্বর বিএন০৯৮৭৭১)।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো দূতাবাসের চিঠিতে বলা হয়, তারা নেপালের বেসরকারি হিমালয়ান এয়ারলাইন্সে দুবাই থেকে কাঠমান্ডু হয়ে ঢাকায় যাচ্ছিলেন। তারা বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে মিলে গেলেও কাঠমান্ডুতে অবস্থিত ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ট্রানজিট এলাকায় ঘোরাফিরার সময় নেপালের কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সন্দেহ হয়। তখনই তাদের আটক করা হয়।
তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে সোনার বার, স্বর্ণালঙ্কারসহ ৪০ ভরি করে সোনা ছিল। ওই রিপোর্ট মতে, নেপালের অর্থমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র সচিব জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের তিনজন মুক্তির জন্য নেপালের কর্তৃপক্ষের কাছে ৭৬ লাখ নেপালি রুপি পরিশোধ করেছেন।
জননিরাপত্তা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে রাষ্ট্রদূত মন্তব্য করেন, স্বল্প সময়ের মধ্যে এত বেশি জরিমানার অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে তাদের একটি চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয় নিশ্চিত করে। আটক অবশিষ্ট ব্যক্তিদের দূতাবাস বন্ড সই দিয়ে আদালত থেকে ছাড়িয়ে আনে।
এদিকে কাঠমাণ্ডু পোষ্টের এক রিপোর্টে ত্রিভুবণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রধান কাস্টম কর্মকর্তা মহেশ ভাট্টারিকে উদ্বৃত করে বলা হয়, গত বছরের ২৯শে নভেম্বরের পর থেকে ৬৭ দিনে ২০৫ কেজি স্বর্ণ আটক করেছেন তারা। এগুলোকে স্বর্ণালংকার হিসেবে নিয়ে আসা হয়েছিল। আমদানি কর প্রদানের পর এর মালিকদের এই স্বর্ণ পুনরধিকার করার অনুমতি দেয়া হয়। এই ২০৫ কেজির মধ্যে আটক করা সোনার বারের হিসেব যুক্ত করা হয়নি।
ভাট্টারি বলেন, যদি এই স্বর্ণালংকার ও সোনার বারের পরিমাণ একসঙ্গে হিসেব করা হয় তাহলে দেখা যাবে দেশের মধ্যে প্রবেশ করা সোনার পরিমাণ অনেক বেশি। নেপাল সরকারের আইন অনুযায়ী স্বর্ণ আমদানির সর্বোচ্চ পরিমাণ হচ্ছে ২০ কেজি।
শুধুমাত্র বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোই এই স্বর্ণ আমদানি করতে পারে। সে হিসাবে গত ৬৭ দিনে ১ হাজার ৩৪০ কেজি সোনা আমদানি করেছে ব্যাংকগুলো। অর্থাৎ, কাস্টমসে যে পরিমাণ সোনা জব্দ করা হয়েছে তা বৈধ পথে আনা সোনার ১৫.২৯ শতাংশ।