দেশে করোনা প্রতিরোধে প্রায় ৯ কোটি ডোজ টিকা বিতরণ করা হয়েছে। আর টিকা কিনতে সরকার এই পর্যন্ত ১৯ হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। আড়াই কোটির বেশি টিকা কোভ্যাক্স সুবিধায় উপহার হিসেবে পাওয়া গেছে। দেশে মোট জনসংখ্যার ৩২ শতাংশ প্রথম ডোজ নিয়েছে। দ্বিতীয় ডোজ টিকা গ্রহণকারীর সংখ্যা ২০ শতাংশ। বিভিন্ন হিসাব করে দেখা যায়, বর্তমানে নিবন্ধনকারীদের এখনই সাড়ে ৪ কোটি টিকা দরকার। সরকার আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে দেশের আট কোটি মানুষকে করোনার দুই ডোজ টিকা দেয়ার পরিকল্পনা করছে। এতে ৫০ শতাংশ মানুষ টিকার আওতায় আসবে বলে সরকার মনে করছে।
বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন সবমিলিয়ে ৫ থেকে ৬ লাখ ডোজ টিকা দেয়া হলেও দৈনিক টিকা দেয়ার পরিমাণও বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে। নানা উদ্যোগ হিসেবে ৬ থেকে আগামী ১২ই নভেম্বর পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে বিশেষ কোভিড টিকাদান ক্যাম্পেইনও পরিচালিত হয়েছে। বস্তিবাসীকেও টিকা দেয়ার বিশেষ কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। দেয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদেরও টিকা।
১৯ হাজার কোটি টাকার টিকা কেনা হয়েছে: করোনার টিকা কিনতে সরকার এ পর্যন্ত ১৯ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করেছে। এ ছাড়া ২১ কোটি ডোজ টিকা কেনা নিশ্চিত হয়েছে। আরও ৮ কোটি ডোজ কেনা হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব লোকমান হোসেন মিয়া এসব তথ্য জানিয়েছেন। গতকাল রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লোকমান হোসেন মিয়া টিকা নিয়ে এসব তথ্য দেন। চিকিৎসা ব্যয়বিষয়ক গবেষণা প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু জানানোর জন্য এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হেলথ ইকোনমিকস ইউনিট। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৯ কোটি ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫ কোটির বেশি মানুষ প্রথম ডোজ এবং প্রায় ৩ তিন কোটি মানুষ পূর্ণ ডোজ টিকা নিয়েছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ক্যান্সার, কিডনি, হার্ট, ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগের (এনসিডিসি) কারণেই বর্তমানে দেশের মানুষের আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই রোগগুলোতে প্রতি বছর দেশে সর্বাধিক মৃত্যুসহ অনেক পরিবার প্রায় নিঃস্ব হয়ে যায়। এই ব্যাপারটির গুরুত্ব অনুধাবন করেই দেশের আট বিভাগেই আটটি উন্নতমানের ১৫ তলা বিশিষ্ট ক্যান্সার, কিডনি, লিভার চিকিৎসার হাসপাতাল নির্মাণ করা হচ্ছে। হাসপাতাল নির্মাণকাজ একেবারেই শেষ পর্যায়ে আছে। এসব হাসপাতালে হাজারো রোগী বিনা খরচে এরকম নন-কমিউনিকেবল ডিজিজগুলোর চিকিৎসা লাভ করবে। এতে করে দেশের মানুষের আউট অব পকেট এক্সপেনডিচার অনেকাংশেই কমে যাবে। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা খাতে কোথায় কী ব্যয় হচ্ছে, মানুষের নিজস্ব ব্যয় কমাতে কী করা উচিত এই দুই বিষয়ে দুটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন হেলথ ইকোনমিকস ইউনিটের মহাপরিচালক মো. শাহাদৎ হোসেন মাহমুদ।
অনুষ্ঠান শেষে লোকমান হোসেন মিয়া বলেন, ১৯ হাজার কোটির কিছু বেশি টাকা দিয়ে টিকা কেনা হয়েছে। এই খরচের মধ্যে উড়োজাহাজে টিকা আনাসহ অন্যান্য খরচ ধরা হয়নি।
নিবন্ধন করে টিকার অপেক্ষায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ: করোনার টিকা পেতে মানুষ নিবন্ধন করে মাসের পর মাস অপেক্ষা করছেন। নিবন্ধনের পর তিন চার মাস পরে টিকার এসএমএস আসারও কথা শোনা গেছে। টিকার এসএমএস আসতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে টিকাপ্রত্যাশীকে। অনলাইনে নিবন্ধনকারীদের ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ এখনো পর্যন্ত এক ফোঁটা ভ্যাকসিনও পাননি। বিভিন্ন হিসাব করে দেখা যায়, বর্তমানে নিবন্ধনকারীদের এখনই সাড়ে ৪ কোটি টিকা দরকার। সরকার আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে দেশের আট কোটি মানুষকে করোনার দুই ডোজ টিকা দেয়ার পরিকল্পনা করছে। এতে ৫০ শতাংশ মানুষ টিকার আওতায় আসবে বলে সরকার মনে করছে। বর্তমানে গড়ে প্রতিদিন সবমিলিয়ে ৫ থেকে ৬ লাখ ডোজ টিকা দেয়া হলেও দৈনিক টিকা দেয়ার পরিমাণও বাড়ানোর কথা ভাবা হচ্ছে। নানা উদ্যোগ হিসেবে ৬ থেকে আগামী ১২ই নভেম্বর পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে বিশেষ কোভিড টিকাদান ক্যাম্পেইনও পরিচালিত হয়েছে। বস্তিবাসীকেও টিকা দেয়ার বিশেষ কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। দেয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদেরও টিকা।
এদিকে, এখন পর্যন্ত দেশে মোট জনসংখ্যার ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ প্রথম ডোজ টিকা পেয়েছেন। আর দ্বিতীয় ডোজ টিকা গ্রহণকারীর সংখ্যা ২০ দশমিক ৪৩ শতাংশ (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস’র সর্বশেষ তথ্যমতে দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯১ লাখ ১০ হাজার)।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০শে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন ৫ কোটি ৪৩ লাখ ৬ হাজার ৮ জন। অন্যদিকে উল্লিখিত সময় পর্যন্ত মোট দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেছেন ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৫১ হাজার ৪০৮ জন। এখন পর্যন্ত দেশে প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে বিভিন্ন টিকা দেয়া হয়েছে ৮ কোটি ৮৮ লাখ ৫৭ হাজার ৪১৬ ডোজ। এই মুহূর্তে দ্বিতীয় ডোজ টিকার দরকার ১ কোটি ৯৭ লাখ ৫৪ হাজার ৬০০ জনের। আর নিবন্ধনকারীদের মধ্যে এক ডোজও টিকা পাননি এমন সংখ্যা ১ কোটি ২৯ লাখ ৭৫ হাজার ৮৭৫ জন। অর্থাৎ এদের প্রত্যেকের ২ ডোজ করে ২ কোটি ৫৯ লাখ ৫১ হাজার ৭৫০ ডোজ টিকা লাগবে। বর্তমানে নিবন্ধনকারীদেরই সবমিলিয়ে টিকা দরকার ৪ কোটি ৫৭ লাখ ৬ হাজার ৩৫০ ডোজ। কিন্তু দুই সপ্তাহ আগে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, টিকা হাতে মজুত আছে ১ কোটি ডোজের বেশি। এরপর দেশে এই মাসে আরও টিকা আসার খবর পাওয়া যায়নি। সূত্র মতে, দেশে উপহার হিসেবে পাওয়া গেছে ৫৪ লাখ ডোজ টিকা। কাভ্যাক্স সুবিধায় বিভিন্ন দেশের নানা টিকা পাওয়া গেছে এখন পর্যন্ত ২ কোটির কিছু বেশি। ২০শে নভেম্বর বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত টিকার জন্য নিবন্ধন করেছেন ৬ কোটি ৭২ লাখ ৮১ হাজার ৮৮৩ জন।
এদিকে, গত ১০ই অক্টোবর রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে দেশের আট কোটি মানুষকে করোনার দুই ডোজ টিকা দেয়া সম্ভব হবে। এতে ৫০ শতাংশ মানুষ টিকার আওতায় আসবে। মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে আরও চার কোটি ডাবল ডোজ টিকা দিতে সক্ষম হবো। মোট ১২ কোটি লোককে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া যাবে আগামী এপ্রিলের মধ্যে, এতে ৭০ শতাংশ মানুষ টিকার আওতায় আসবে। তিনি আরও জানান, অক্টোবরে তিন কোটি, নভেম্বরে পৌনে চার কোটি, ডিসেম্বরে পাঁচ কোটি ও জানুয়ারিতে পৌনে চার কোটি ডোজ টিকা আসবে। দেশে একদিনে ৮০ লাখের বেশি টিকা দিয়েছি। যদি প্রয়োজন হয় এর থেকেও বড় ক্যাম্পেইনের চিন্তা রয়েছে। প্রতি মাসে কর্মসূচি নেয়ার কথা ভাবছি। দৈনিক টিকা দেয়ার পরিমাণ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে দৈনিক ১০ থেকে ১৫ লাখ টিকা দেয়ার কথা বলছি। ওই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা এখন পর্যন্ত সাত কোটি ২২ লাখ টিকা পেয়েছি। তিনি বলেন, নিবন্ধন আরও বাড়ানো হবে। ৭ই নভেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুরে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক জানিয়েছেন, দেশে ভ্যাকসিনের কোনো ঘাটতি নেই। তিনি আরও জানান, হাতে এক কোটির উপরে ভ্যাকসিন আছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব মানুষকেই ভ্যাকসিন দেয়া হবে। সেজন্যই আমরা ২১ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন কিনে রেখেছি। সেখান থেকে এ মাসে অন্তত তিন কোটি ডোজ ভ্যাকসিন আসবে। আগামী মাসেও একই হারে আসার কথা রয়েছে। আগামী বছর জানুয়ারি মাসের মধ্যেই অন্তত ১২ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন দেয়া সম্ভব হবে।
প্রসঙ্গত, দেশে করোনার টিকাদান উদ্বোধন হয় চলতি বছরের ২৭শে জানুয়ারি আর গণটিকাদান কর্মসূচি শুরু হয় ৭ই ফেব্রুয়ারি থেকে।