চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বিএম কন্টেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় অনেকেই দগ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। তাদেরই মধ্যে একজন মমিনুল হক। মহসিন কলেজ থেকে কিছুদিন আগেই অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করে তিনি সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোতে শ্রমিক হিসেবে চাকরিতে ঢুকেছিলেন।
তার পরিকল্পনা ছিল, পরিবারের অভাব দূর করার জন্য এক বছর চাকরি করেই স্নাতকোত্তর শেষ করবেন। কিন্তু সীতাকুণ্ডের বিএম ডিপোর বিস্ফোরণে মমিমুলের সঙ্গে তার সেই স্বপ্নও আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে।
মৃত্যুর আগে মমিনুল হকের শেষ কথা হয়েছিল তার বাবা ফরিদুলের সঙ্গে। ডিপোর বিস্ফোরণে ততক্ষণে মমিনুলের এক পা উড়ে গেছে। ক্রমাগত বিস্ফোরণ অব্যাহত থাকায় মমিনুল বুঝতে পেরেছিলেন, পরিবারের অভাব দূর করার স্বপ্নপুরণের আগেই তাকে না ফেরার দেশে পাড়ি দিতে হবে। মৃত্যুর আগে বাবার সঙ্গে ফোনালাপে তাই মমিনুলের অনুরোধ ছিল, তাকে যেন কালেমা পড়ে দেওয়া হয়।
মমিনুলের বাবা ফরিদুল ছেলের সঙ্গে হওয়া শেষ কথোপকথনের প্রসঙ্গে বলেন, “ফোনেই ছেলের আর্তচিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। সে চিৎকার করে বলছিল- ‘বাবা এখানে কিছুক্ষণ পরে পরে ব্লাস্ট হচ্ছে।’ দ্বিতীয়বার ফোন করে মমিনুল বলেছিল, ‘বাবা আমার একটা পা উড়ে গেছে। আমাকে কালেমা পড়ে দেন।’ এটাই আমার সঙ্গে তার শেষ কথা।”
ফরিদুল জানান, মমিনুলের সঙ্গে কথা শেষে তিনি চট্টগ্রাম শহরে থাকা নিজের স্বজনদের ফোন করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে বলেন। পরে তার চাচা খোরশেদ আলম হাসপাতালে এসে ভাতিজার মরদেহ দেখতে পান। পরিবারে দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে মমিনুল মেজ।
নিহত মমিনুলের খালাতো ভাই তায়েব দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, “তিন মাস আগে মহসিন কলেজ থেকে ইকোনমিক্সে অনার্স শেষ করে চাকরি শুরু করে মমিনুল। সে আমাকে বলেছিলো মানুষ তিন-চার বছর চাকরি করেও পড়ালেখা করে, আমি এক বছর চাকরি করে ঘরের আর্থিক অবস্থা ফেরাতে চাই, এরপর মাস্টার্স পরীক্ষা দেবো। কিন্তু সেটা হলো না।”
তিনি আরও বলেন, “মমিনুল শনিবার রাত ৮টার দিকে ডিপোতে যান। ৯টার সময় ফোন দিয়ে সে শুধু বলেছে- ‘ভাই আমাকে বাঁচা’। হাসপাতালে এসে দেখি আমার ভাই আর নাই।”
সীতাকুণ্ডের বিএম কন্টেইনার ডিপো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক-সংলগ্ন সীতাকুণ্ডের শীতলপুর এলাকায় ৭০ কানি জায়গার ওপর অবস্থিত। আমদানি-রপ্তানি করা বিভিন্ন পণ্য এই ডিপোতে রাখা হয়। শনিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, এ বিস্ফোরণে দুই শতাধিক মানুষ আহত ও দগ্ধ হয়েছেন। ইতোমধ্যে এ বিস্ফোরণের ঘটনায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৩ জনে দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে রয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের পাঁচজন কর্মীও।
কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডে আহতদের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বেসরকারি পার্কভিউ হাসপাতাল ও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১৭০ জনের বেশি শ্রমিক। এদের মধ্যে ৩০ জনের অবস্থা গুরুতর।
চমেক বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, “হাসপাতালের বার্ন ইউনিট ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি ৫০% রোগীর অবস্থাই আশঙ্কাজনক। স্থান সংকুলান না হওয়ায় বেশ কয়েকজন রোগীকে অন্যান্য ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে।”
বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের রেজিস্টার ডা. লিটন পালিত বলেন, “প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি হওয়া রোগীদের ১৭ জনের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। এসব রোগীর যেকোনো সময় যে কোনো কিছু ঘটে যেতে পারে।”
৮ ঘণ্টার ওপরে জ্বলতে থাকা আগুন এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি জানিয়ে ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, “আগুন নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন স্টেশনের ২৪টি ইউনিট কাজ করছে। কিছুক্ষণ আগে ফেনী ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট এসে কাজ শুরু করেছে।”