শেরপুর: শেরপুরের শ্রীবরদীতে মায়ের বিরুদ্ধে শিশু সন্তানকে পুড়িয়ে মারার অভিযোগ করেছে শিশুটির বাবা আমিন মিয়া। শুক্রবার রাতে উপজেলার ভেলুয়া ইউনিয়নের চরহাবর এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। আমিন মিয়ার পরিবারের অভিযোগ, এ ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে অভিযোগ নেয়নি শ্রীবরদী থানা পুলিশ। এমনকি আদালতে মামলা করলেও কোন সহযোগিতা করা হবে না বলে জানিয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপ্লব কুমার বিশ্বাস। শুক্রবার রাত সোয়া দুইটার দিকে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে এই অভিযোগ করেন, থানায় মামলা করতে আসা আমিন মিয়া ও তার পরিবার।
শ্রীবরর্দীতে অগ্নিকান্ডে বসতবাড়ি পুড়ে ছাই ও এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় সংবাদ সংগ্রহ শেষে থানা পুলিশের ব্ক্তব্য নিতে শ্রীবরদী থানায় গণমাধ্যমকর্মীরা গেলে, এসব অভিযোগ করেন তারা। এ সময় অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কক্ষে তার বক্তব্য নিতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে কল করেও পাওয়া যায়নি ওসি বিপ্লব কুমার বিশ্বাসকে। তাদের অভিযোগ, থানায় মামলা না নিয়ে বরং খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে তাদের সাথে। আদালতে মামলা করলেও কোন সহযোগিতা করা হবে না বলেও জানানো হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।
এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে আজ দুপুরে গণমাধ্যমকর্মীর ফোনে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপ্লব কুমার বিশ্বাস বলেন,
“শিশুটির বাবা একজন ফাজিল ছেলে। সে তিন বছর তাদের কোন খোঁজ খবর না নিয়ে এখন আসছে মায়া কান্না করতে।” মামলা কেন নেয়া হয়নি, এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “চাকরি চলে গেলেও ফাজিলের বিষয়ে কোন কথা বলে সময় নষ্ট করতে চাই না। আপনার (সাংবাদিকের) সময় অনেক, আপনি এ বিষয়ে কথা বলতে পারেন। আমার সময় নেই, আমি কথা বলতে চাই না। পারলে আপনারা তদন্ত করেন গিয়ে।”
একজন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এমন মন্তব্যে বিব্রত শেরপুরের গণমাধ্যমকর্মীরা। একজন বাবার মামলা না নিয়ে, ঘটনার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তাকে সহযোগিতা না করে বরং ফাজিল ও বেয়াদব শব্দ চয়নে বিব্রত হয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা। ঘটনার তদন্ত না করে এমন মন্তব্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, মনে করছেন অনেকেই।
স্থানীয়দের তথ্যমতে,গত পাঁচ বছর আগে ভেলুয়া ইউনিয়নের নুরু মিয়ার ছেলে স্থানীয় আমিন মিয়ার সাথে একই এলাকার ইছাহাক আলীর মেয়ে রত্না আক্তারের বিয়ের পর থেকেই দাম্পত্য কলহ চলছিলো। শুক্রবার বিকেলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে এ বিষয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করলেও আমিন মিয়ার পরিবার অনুপস্থিত ছিলো। আজ শনিবার তাদের দুজনের তালাকের বিষয়ে সিদ্ধান্তের কথা ছিলো বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য সুলতান সরকার।
স্থানীয়রা বলেন, আমিন মিয়ার সাথে রত্না আক্তারের বিয়ের পর থেকেই দাম্পত্য কলহ চলছিলো। গত প্রায় তিন বছর আগে আমিন মিয়া কাজের সন্ধানে ঢাকায় যায়। পরবর্তীতে সেখানে আরও একটি বিয়ে করার সন্দেহে দাম্পত্য কলহ চরমে পৌঁছে। এরইমধ্যে বেশ কয়েকবার স্থানীয়দের নিয়ে শালিশ বৈঠকও হয়। দাম্পত্য কলহের কারণে রত্না আক্তার তার মায়ের বাড়ি চলে যায়। আমিনের মা রত্নাকে আনতে গেলে না এসে তাকে অপমান করে পাঠিয়ে দেয়া হয়। শুক্রবার বিকেলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে এবিষয়ে আবারও বৈঠকের আয়োজন করলেও আমিন মিয়ার পরিবার অনুপস্থিত ছিলো।
এদিকে শুক্রবার রাতে রত্না আক্তারের বাবার বাড়িতে গোয়াল ঘরে দেয়া ধোঁয়া থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে গোয়াল ঘরসহ দুইটি বসত ঘর পুড়ে যায়। পরবর্তীতে গোয়াল ঘরে তাদের চার বছরের শিশু ইসমাঈলের মরদেহ পাওয়া যায়। তবে শিশুটির বাবা আমিন মিয়ার অভিযোগ, দাম্পত্য কলহের কারণে তালাকের পর যাতে কোন সমস্যা না হয়, এজন্য শিশুকে পুড়িয়ে মেরেছে শিশুটির মা রত্না আক্তার।
নিহত ইসমাইলের বাবা আমিন মিয়া শুক্রবার রাতে শ্রীবরদী থানা চত্বরে গণমাধ্যমকর্মীদের অভিযোগ করে বলেন, এক লক্ষ টাকা দেনমোহরে রত্নাকে বিয়ে করলেও কিছুদিন আগে রত্নার পরিবার এবং এলাকবাসীর চাপে নতুন করে চার লক্ষ টাকা দেনমোহর ধরা হয়েছে। তারপর থেকে রত্না ও তার পরিবার থেকে আমিন মিয়াকে ডিভোর্সের জন্য চাপ দিয়ে আসছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রত্না বলেন, ভয় পেয়ে গোয়াল ঘরে পালানোর কারণেই মৃত্যু হয়েছে ইসমাইলের।
আমিন মিয়ার বাবা নুরু মিয়া (শিশুটির দাদা) বলেন,আমার ছেলের সাথে তালাকের পর যাতে কোন ঝামেলা না হয়, এজন্য আমার নাতিকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। তাদের বাড়িতে আমার নাতি মারা গেছে, আমরা থানায় আসছি, কিন্তু পুলিশ আমাদের মামলা নেয় নাই। আমরা মূর্খ মানুষ, কিছু জিজ্ঞেসও করতে পারতেছি না।
৭নং ভেলুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল করিম বলেন, তাদের পারিবারিক কলহের জেরে কয়েক দফায় শালিশ করতে হয়েছে। শুক্রবার দুপুর তিনটায় দুই পক্ষকেই আসতে বলেছিলাম। বিকেল চার টার মধ্যে ছেলে পক্ষ না আসায় গুরুত্বপূর্ণ কাজে আমি ইউএনও অফিসে চলে যাই। পরে রাতে ইউনিয়ন পরিষদে যাবার পরে শুনি মেয়ের বাড়িতে আগুন লেগে তাদের ছেলের মৃত্যু হয়েছে।
এ ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের হলেও বাবার অভিযোগ গ্রহণ করেনি পুলিশ। থানা কিংবা কোর্টেও মামলা না নেয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে এ বিষয়ে ফোনে একাধিকবার কল করে ও থানায় গিয়েও শুক্রবার রাতে পুলিশের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এদিকে আজ সকালে এ বিষয়ে ব্ক্তব্য নিতে ওসিকে ফোন দেয়া হলে মুঠোফোনে জানান, এই ফালতু বিষয়ে সময় নষ্ট করার মত সময় আপনাদের থাকতে পারে আমার নেই। আমার চাকরি চলে গেলেও ওই ফালতুর বিষয়ে আমার কোন ভাবনার কিছু নেই।