ফিল্ডিংয়ে উইকেটের পেছনে থাকা অবস্থায় যখন বাউন্সার বল লাফিয়ে ধরতে যান মোহাম্মদ রিজওয়ান, তখন পায়ের পেশির পুরনো চোট আবারও কয়েক মিনিটের জন্য ভোগায় তাকে। তবে পাকিস্তানি ধারাভাষ্যকার বলছিলেন,’ আমি তাকে চিনি, সে একজন যোদ্ধা। খুব বেশি ব্যাথা না পেলে সে আবারও উঠে দাঁড়াবে।’
সেই যোদ্ধা আজ ভারতের দেওয়া ১৮২ রানের বড় লক্ষ্যকে টপকে যেতে দলের হয়ে লড়লেন সবচেয়ে বেশি। তাকে ঝড়ো ইনিংসে যোগ্য সঙ্গ দিলেন নওয়াজ। আর শেষদিকে আসিফ আলি আর খুশদিল শাহর দায়িত্বশীল ফিনিশিং। তাতে ৫ উইকেটের জয়ে এক সপ্তাহ আগে ভারতের বিপক্ষে হারের শোধ তুলল বাবর আজমের দল।
দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আজ চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারত পাকিস্তান লড়াইয়ের শেষ হাসি হাসল পাকিস্তান। ওপেনার রিজওয়ানের ৫১ বলে ৭১ আর সঙ্গে নওয়াজের ২০ বলে ৪২ রানের ঝড়ো ইনিংসের পর আসিফ- খুশদিলের ক্যামিওতে জয় পেল পাকিস্তান।
দুবাইতে যেখানে ১৫০ প্লাস স্কোরে ফাইট করা যায়, সেখানে ১৮০ এর বেশি রান করেও পাকিস্তানের কাছে এক সপ্তাহের ভেতর জয়ের পর হারের স্বাদ পেলেন রোহিতরা।
১৮২ রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে প্রথম ১০ ওভার শেষে পাকিস্তানের স্কোর দাঁড়ায় ২ উইকেটে ৭৬ রান। ওপেনার ও অধিনায়ক বাবর আর টপ অর্ডার ফখর জামান ততক্ষণে প্যাভিলিয়নে। বাকি দশ ওভারে তখনও দরকার ছিল ১০৬ রানের। যা এই মাঠে খুব সহজ নয়।
তবে ক্রিজে থাকা আরেক ওপেনার রিজওয়ান আর নওয়াজ মিলে তখন তুললেন ঝড়। ১১ থেকে ১৫ ওভারে নিলেন ৬০ রান। সেখানে ম্যাচের সবচেয়ে বড় ভিত পায় পাকিস্তান। রিজওয়ান আর নওয়াজ পরের দুই ওভারে ফিরে গেলে আবারও মোড় নেয় ম্যাচ।
সেখান থেকে পাকিস্তানকে জয়ের কাছে নিয়ে যায় আসিফ-খুশদিল জুটি। ইনিংসের দুই বল বাকি থাকতে আসিফ আউট হলে ম্যাচে আবারও উত্তেজনা ছড়ায়। তবে ইফতিখার আহমেদ এক বল বাকি থাকতেই ম্যাচ জিতিয়ে মাঠ ছাড়েন ক্রিজে থাকা খুশদিলকে নিয়ে।
বড় রানের লক্ষ্যে খেলতে নেমে শুরুতে দেখেশুনে ব্যাট চালাতে থাকেন পাকিস্তানের দিই ওপেনার। কিন্তু আজও ব্যর্থ হন বাবর।
রবি বিষ্ণুর করা প্রথম ওভারেই ফিরে যান বাবর আজম। মিড উইকেটে ক্যাচ দেন রোহিতের হাতে। ১০ বলে ২ চারে শুরুতে ভালো খেলার ইঙ্গিত দিলেও মাত্র ১৪ রানে আউট হন পাক অধিনায়ক। এ নিয়ে এশিয়া কাপে টানা তিন ম্যাচে টি-টোয়েন্টির এক নম্বর ব্যাটার নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। চতুর্থ ওভারে দলীয় ২২ রানে বাবরকে হারিয়ে শুরুতে খানিকটা বিপদে পড়ে পাকিস্তান।
কিন্তু সে বিপদকে এক পাশে রেখে প্রথম ৪ ওভারে ২২ রান হলেও পরের দুই ওভারে যথাক্রমে ১৪ ও ৮ মিলিয়ে আরও ২২ তুলেন মোহাম্মদ রিজওয়ান ও ফখর জামান।
রিজওয়ান-ফখরে দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে ম্যাচে আবারও লড়াইয়ে ফেরা পাকিস্তান। তবে দ্রুত রান তুলতে শুরু করা এ জুটিকে ৯ম ওভারে গিয়ে থামান ইয়ুজবেন্দ্র চাহাল।
এ স্পিনারের করা তৃতীয় বলে এক চারের মারের পরই লং অনে তুলে মারেন ফখর। ধরা পড়েন কোহলির কাছে। ভাঙে ৩০ বলে ৪১ রানের জুটি। আউটের আগে ১৮ বলে ১৫ রান করেন ফখর।
৬৩ রানে দ্বিতীয় উইকেটের পতনের পর মোহাম্মদ নওয়াজ নিয়ে দলের হাল ধরেন রিজওয়ান। নওয়াজ উইকেটে আসার পর রানের গতি আরও বাড়ে।
শুরুতেই ভারতীয় বোলারদের ওপর চড়াও হন নওয়াজ। সেইসাথে ৩৭ বলে ব্যক্তিগত অর্ধ-শতকের দেখা পান গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ফর্মে থাকা পাকিস্তানি উইকেটকিপার।
তৃতীয় উইকেট জুটিতে মাত্র ৪১ বলে ৭৩ রান তুলেন রিজওয়ান-নওয়াজ। বিপদজনক হয়ে উঠেন এ দুজন। ভারতের কোনো বোলারই পাত্তা পাচ্ছিলেন না তাদের সামনে।
শেষ পাঁচ ওভারে যখন দলের দরকার ৪৬ রান। তখন ১৭ বলে ২ ছক্কা আর ৬ চারে ৪২ রানে ব্যাট করছিলেন নওয়াজ। আর অন্য প্রান্তে ৫০ এরও বেশি রান নিয়ে ছিলেন রিজওয়ান। তখনও ম্যাচ পাকিস্তানের অনেকটা হাতে।
১৬তম ওভারে এসে মাত্র ৪ রান দিয়ে নওয়াজকে তুলে নেন ভুবনেশ্বর কুমার। আর পরে ওভারে নওয়াজের মতো সমান বাউন্ডারি হাঁকানো রিজওয়ানকে ফেরত পাঠান গোটা ম্যাচে বাজে বল করা হার্দিক পান্ডিয়া। পরপর দুইজন সেট ব্যাটারকে আউট করে ম্যাচে আবারও ফেরে ভারত।
যখন শেষ ১৯ বলে দরকার পড়ে ৩৫ রানের পঞ্চম উইকেটে আসিফ-খুশদিল মিলে তুলেন ১৭ বলে ৩৩ রান। শেষ ৩ ওভারে দরকার ছিল ৩৪ রান।
তখন ১৮তম ওভারে এসে আজকের ম্যাচে সুযোগ পেয়ে আলো ছড়ানো বিষ্ণুই দেন মাত্র ৮ রান। তাকে মোকাবেলা করতে বেগ পেতে হয় আসিফ-খুশদিল জুটির।
কিন্তু ভুবনেশ্বরের করা পরের ওভারেই হাত খুলে মারেন আসিফ। যেন ২০২১ টি-টোয়েটি বিশ্বকাপের ফর্ম ফিরিয়ে আনেন তিনি। সাথে সঙ্গ দেন খুশদিল। দুই চার আর এক ছক্কায় ১৯তম ওভারেই ১৯ রান তুলে ম্যাচ নিজেদের করে নেন তারা।
অর্শদীপ সিংয়ের করা ইনিংসের শেষ ওভারের দ্বিতীয় বলে আসিফ চার হাঁকালে শেষ ৩ বলে দরকার হয় ২ রানের। তখন এক বল নষ্ট করে পরের ডেলিভারিতেই ব্যক্তিগত ১৬ রানে (৮ বলে) আউট হন আসিফ। তখন দর্শকদের মাঝে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের আবহ আবারও দেখা দেয়। কিন্তু পাকিস্তানকে কোনো বিপদে না ফেলে এক বল বাকি থাকতেই নিজের খেলা প্রথম বলে দুই রান নিয়ে জয় নিশ্চিত করেন ইফতেখার। ১১ বলে ১৪ রান করে অপরাজিত ছিলেন খুশদিল।
বল হাতে সবচেয়ে খরুচে ছিলেন আগের ম্যাচের নায়ক হার্দিক। ৪ ওভারে ৪৪ রান দেন তিনি। সেইসাথে ৪০ ও ৪৩ রান খরচ করেন কুমার ও চাহাল।
এর আগে চলতি এশিয়া কাপে গ্রুপ পর্বের ম্যাচের পর সুপার ফোরের বোরবারের ম্যাচে টসে জিতে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তান। তাতে রোহিত শর্মা ও লোকেশ রাহুলের উড়ন্ত সূচনার পর ভিরাট কোহলির অর্ধশতকে (৪৪ বলে ৬০ রান) ভর করে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ১৮১ রান সংগ্রহ করে টিম ইন্ডিয়া।