নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘ভাঙচুর ও লুটপাটের’ ঘটনায় ৫০ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকার ক্ষতি হয়েছে জানিয়ে এর নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে বিএনপি। রোববার গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এই ক্ষতির তথ্য তুলে ধরেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, হার্ডডিস্ক, নথিপত্র, ব্যাংকের কাগজপত্র ও নগদ অর্থ লুট করা হয়েছে; যা প্রকৃতপক্ষে একটি ডাকাতির ঘটনা।’
এই হামলার বিরুদ্ধে আদালতে যাবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছি। আমরা দেখব। তারপর কী করব এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। সিদ্ধান্ত নিলে তা আপনারা জানতে পারবেন।
গণমিছিলের তারিখ বদল গণতান্ত্রিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ উল্লেখ করে খন্দকার মোশাররফ বলেন, আমাদের দল মধ্যপন্থি গণতান্ত্রিক দল। আমরা সংঘাতের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমাদের আচরণ গণতান্ত্রিক। আমরা গণতান্ত্রিক আচরণ অতীতে দেখিয়েছি, ভবিষ্যতেও দেখাব। একটি রাজনৈতিক দল আরেকটি রাজনৈতিক দলের প্রতি সহনশীল হবে, তাদের মতামত, তাদের বক্তব্য রাখার সুযোগকে আরও সহজ করে দেবে-এটাই আমাদের নীতি। সেই নীতির প্রেক্ষাপটে আমাদের গণমিছিলের তারিখ পরিবর্তন করেছি। এটা আমাদের রাজনৈতিক দর্শন ও চিন্তাধারার প্রতিফলন।
১০ ডিসেম্বর বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ ছিল। গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে দুদিন আগে ৭ ডিসেম্বর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে অবস্থান নেন দলটির কিছু নেতাকর্মী। রাস্তা থেকে নেতাকর্মীদের সরানোকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে বিএনপির ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় একজন নিহত হন। পুলিশ ও বিএনপি উভয়পক্ষের অনেকে আহত হন। সেদিনই বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে দলটির কয়েকশ’ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। কার্যালয় থেকে ককটেল উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ। ৭ ডিসেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশের অভিযানে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানাতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিএনপি।
সংবাদ সম্মেলনে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, ইকবাল হাসান মাহমুদ, সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান এজেডএম জাহিদ হোসেন, আব্দুল আউয়াল মিন্টু, মো. শাহজাহান, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন স্বপন ও ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেন, ৭ ডিসেম্বর দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশি হামলা হয়। সেদিন পুলিশের ছত্রছায়ায় ক্ষমতাসীন দলের সন্ত্রাসীরা বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢোকে। তারা বিভিন্ন কক্ষে ভাঙচুর চালায়। মালামাল লুটে অংশ নেয়। কোনো অফিস বা গৃহে তল্লাশির সময় মালিকপক্ষ, নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের সাক্ষী হিসাবে রাখার সাধারণ আইন আছে। কিন্তু বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অভিযানের ক্ষেত্রে পুলিশ তা অগ্রাহ্য করেছে।
তিনি বলেন, পুলিশের কিছু কর্মকর্তা ও সদস্য দলীয় কর্মীর মতো প্রতিপক্ষকে হেয়-বিপদাপন্ন করার জন্য সেদিন সাদা ব্যাগে করে নিজেরাই ককটেল নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে গেছেন। পরে তারা ককটেল উদ্ধারের নাটক সাজিয়েছেন, যা গণমাধ্যম ও সামাজিকমাধ্যমের কল্যাণে দিবালোকের মতো পরিষ্কার হয়েছে। ৭ ডিসেম্বরের ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে যে মামলা হয়েছে, তার বরাত দিয়ে খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, মামলায় বলা হয়েছে, বিএনপি নেতাকর্মীরা নাকি ইট, পাথর, বাঁশের লাঠি ও ককটেল নিয়ে পুলিশের ওপর আক্রমণ করেছে। আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত কয়েক হাজার পুলিশকে ইট, পাথর, বাঁশের লাঠি ও কথিত ককটেল দিয়ে আক্রমণ করার মতো হাস্যকর অভিযোগ জনগণ বিশ্বাস করে না। পুলিশের এজাহারে বলা হয়েছে, তারা ৭ ডিসেম্বর বিকালে মোট ১৭৯টি কাঁদানে গ্যাসের শেল ও ৪৬০টি শটগানের গুলি ছুড়েছে। এ ছাড়া ছয়টি সাউন্ড বোমা নিক্ষেপ করেছে। প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হবে বলে মনে করে বিএনপি।
মোশাররফ হোসেন বলেন, পুলিশের ওপর আক্রমণের আলামত দেখানো হয়েছে, ফুটপাত ও রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পাওয়া পাঁচ বস্তা ইটের টুকরো; যা শহরের যেকোনো সড়ক থেকে যেকোনো সময় সংগ্রহ করা যায়। ৮০টি বাঁশের লাঠি, যা শহরের বহু স্থানে প্রকাশ্যে বিক্রয়ের জন্য রাখা হয়। লাল টেপে মোড়ানো কথিত ককটেলের ভগ্নাংশ, যা ব্যবহৃত কাঁদানে গ্যাসের শেল কিংবা পথের আবর্জনার অংশ হতে পারে। পুলিশের এজাহারে কোনো চালের কথা নেই, চালের বিষয় সম্পূর্ণ বানোয়াট। এসব গল্প এখন শুধুই কৌতুকের খোরাক, অক্ষমের আর্তনাদ। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ হামলা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন। যেকোনো সভ্য দেশে এমন সব ঘটনা শুধু অপ্রত্যাশিত ও অনভিপ্রেত নয়, এমন বর্বরতা ও ষড়যন্ত্র মূলত নিষ্ঠুরতার নামান্তর। তিনি জানান, নয়াপল্টনের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে চারটি মামলা করেছে যাতে ৪৫০ জন কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতারসহ দেড় হাজার থেকে ২ হাজার অজ্ঞাত আসামি দেখানো হয়েছে। এ ঘটনার পর গত কয়েক দিনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৩শ’ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ৭ ডিসেম্বরের ঘটনায় যেসব রাজনৈতিক দল-সংগঠন ও ব্যক্তি দলীয় কার্যালয়ে এসেছে সহমর্মিতা প্রকাশ করেছে, নিন্দা জানিয়েছে তাদের প্রতি দলের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানান তিনি। সংবাদ সম্মেলন থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ নেতাকর্মীদের মুক্তি দাবি করা হয়।
#যুগান্তর