রাজশাহীর বেসরকারি শাহমখদুম মেডিকেল কলেজের প্রতারিত ৪২ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন এখন ধ্বংসের পথে। এমবিবিএস প্রফেশনাল কোর্সে ভর্তির জন্য কেউ দিয়েছেন ১৫ লাখ কেউ দিয়েছেন ১৮ লাখ টাকা। শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন না থাকার পরও ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস কোর্সে শিক্ষার্থী ভর্তির চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় একটি দৈনিক পত্রিকায়।
পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে শিক্ষার্থীরা ঠাহর করতে পারেননি সেটি একটি প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন। ভর্তির দুই বছর পর তারা জানতে পেরেছেন শাহমখদুম মেডিকেল কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তির কোন অনুমোদনই নেই। তারা এখন দিশেহারা।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, ডাক্তার হবার অদম্য আকাঙ্ক্ষায় পরিবারের বসতভিটা জমিজমা বিক্রি করে এই দুই শিক্ষাবর্ষে শাহমখদুম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন মোট ৪২ জন শিক্ষার্থী। এতো দিনেও শিক্ষার্থীরা কেউ রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও বিএমডিসির নিবন্ধন পাননি। প্রতারণার শিকার শিক্ষার্থীরা এখন পথে পথে ঘুরছেন।
অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিকেল কলেজে নতুন করে ভর্তিরও সুযোগ নেই। এখন দিশেহারা এসব শিক্ষার্থীর দাবি অন্য কোনো প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে তাদেরকে মাইগ্রেশন দেওয়ার। কিন্তু রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। প্রতারিত এসব শিক্ষার্থীর অনেকেই কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন।
গত ২৩ মার্চ রাজশাহীতে সংবাদ সম্মেলন করেছেন মাইগ্রেশনের দাবিসহ বিভিন্ন দাবিতে। সংবাদ সম্মেলনে তারা আত্মহত্যার হুমকিও দিয়েছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও রামেবি সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর বেসরকারি শাহমখদুম মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের এমন প্রতারণা এই প্রথম নয়। ২০১৪ সালে শাহমখদুম মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস প্রোগ্রামে প্রথম ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। তবে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না হওয়ায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও একাডেমিক অনুমোদন দেননি প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না হওয়ার কারণে।
জানা গেছে, শাহমখদুম মেডিকেল কলেজ প্রথমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। কলেজটির প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন রাজশাহী-১ আসনের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরী। রাবির একাডেমিক কাউন্সিল ২০১৫-১৬ শিক্ষা বর্ষে শর্তসাপেক্ষে সর্বোচ্চ ২৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন দেন। কিন্তু কলেজটি ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুজ্জামান স্বাধীন প্রতারণামূলকভাবে ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করেন। ফলে রাবি কর্তৃপক্ষ শাহমখদুম মেডিকেল কলেজে ওই শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়াসহ পরবর্তীতে নতুন করে শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন বাতিল করেন।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও রামেবির পক্ষ থেকে পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে শাহমখদুম মেডিকেল কলেজে কোনো শিক্ষার্থীকে ভর্তি না হতে পরামর্শ দিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা জানান, তারা ভর্তি হওয়ার দুই বছর পর জানতে পারেন শাহমখদুম মেডিকেল কলেজের কোনো বর্ষেরই অনুমোদন নেই। শুরু থেকেই কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থী ভর্তির নামে প্রতারণা করে আসছেন। এখন পর্যন্ত শাহমখদুম মেডিকেল থেকে মাত্র ৪ জন শিক্ষার্থী এমবিবিএস সম্পন্ন করলেও তাদেরকে চিকিৎসক হিসেবে নিবন্ধন দেয়নি মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল। ২০২০ সালের আগের কয়েক ব্যাচের শিক্ষার্থীদের অন্য প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে মাইগ্রেশন দেওয়া হয়। ওই সময় শিক্ষার্থীরা ব্যাপক বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শাহমখদুম মেডিকেল কলেজের সব শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেন। সরকারি নির্দেশে কিছু দিন কলেজটি বন্ধ ছিল।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগে আরও বলেন, শাহমখদুম মেডিকেল কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুজ্জামান স্বাধীন একজন প্রতারক। কৌশলে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান করেন সাবেক সচিব জিল্লার রহমানকে। রামেবির অধিভুক্ত ও বিএমডিসির অনুমোদন না থাকার পরেও দুই শিক্ষাবর্ষে ৪২ জন শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। আদায় করা হয় মোটা অংকের টাকা। প্রতারিত এই শিক্ষার্থীরাই এখন পথে বসেছে। তাদের শিক্ষাজীবন এখন ধ্বংসের পথে।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান মুন্না, ইশতিয়াক হাসান ও সাবিয়া খাতুনসহ অন্য শিক্ষার্থীরা জানান, তারা চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হয়ে শাহমখদুম মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পরে আমরা জানতে পারি আমরা বড় ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছি। কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে টাকা ফেরত চাইলে আমাদেরকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। কলেজের চেয়ারম্যান সাবেক সচিব জিল্লার রহমানের কাছে গেলে এখন বলছেন তিনি শাহমখদুম কলেজের কেউ না। তার সম্মতি ছাড়াই চেয়ারম্যান হিসেবে তার নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্বাধীন তাদেরকে বলেছেন, এখন তারও কিছু করার নেই। শিক্ষার্থীদের প্রতারণা করে এমডি স্বাধীন কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে গায়ে বাতাস দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, তারা সংবাদ সম্মেলন করায় এমডি স্বাধীন জোরপূর্বক তাদের হোস্টেল থেকে বের দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীরা কয়েকদিন আগে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে রাজশাহী চন্দ্রিমা থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
শিক্ষার্থীরা আরও জানান, ২১ জন শিক্ষার্থী কর্তৃপক্ষের প্রতারণার প্রতিকার ও শিক্ষাজীবন বাঁচানোর দাবিতে রাজশাহীর একটি আদালতে মামলা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করেছেন।
এক শিক্ষার্থীর ভাই আব্দুল মোতালেব জানান, শাহমখদুম মেডিকেল কলেজে তার বোনের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন ভেস্তে যাওয়ার শোকে তার বাবা স্ট্রোক করে দেড় বছর আগে মারা গেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাহমখদুম মেডিকেল কলেজটি প্রতিষ্ঠার কোনো সময়েই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের কোনো শর্তই পূরণ করতে পারেনি। কলেজটিতে কোনো স্থায়ী শিক্ষক নেই শুরু থেকেই। নেই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। ল্যাব বা ব্যবহারিক পাঠশিক্ষার কোনো সুযোগ সুবিধা নেই। প্রথম অনুমোদন দেওয়ার পর থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাগাদা দিলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ তা পূরণ না করে বরাবরই প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে।
শাহমখদুম মেডিকেল কলেজের ৪২ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন রক্ষায় করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এজেএড মোস্তাক হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত ছাড়া তাদের কিছু করণীয় নেই। মন্ত্রণালয় প্রতারিত শিক্ষার্থীদের মাইগ্রেশন দিলে তবেই সম্ভব।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহমখদুম মেডিকেল কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুজ্জামান স্বাধীন বলেন, ২০২০ সালে মন্ত্রণালয় কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করেন। তবে মন্ত্রণালয়ের সেই আদেশটির কার্যকারিতা উচ্চ আদালত স্থগিত করেন। ফলে আমরা ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ বর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি করেছিলাম। যারা বিজ্ঞাপন দেখে ভর্তি হয়েছিলেন পুরোটা দায় তাদের। তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়নি বলে দাবি করেছেন স্বাধীন।