দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দরে গত অর্থবছরের তুলনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বেশি রাজস্ব আয় হয়েছে। এ সময়ে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬২৭ কোটি ১২ লাখ টাকা। বিপরীতে এসেছে ৬৪১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। হিলি শুল্ক স্টেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, গত অর্থবছরে আমদানি অর্ধেকে নামলেও পণ্যের শুল্কায়ন বাড়ায় লক্ষ্যমাত্রার বেশি রাজস্ব আয় হয়েছে।
বন্দর-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজস্ব আয় বাড়লেও বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি অর্ধেকে নেমেছে। সেইসঙ্গে শুল্কায়ন অতিরিক্ত বেড়েছে। আমদানি-রফতানিতে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। পণ্যের শুল্কায়ন না বাড়িয়ে বরং কমালে আমদানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও রাজস্ব বাড়তো। জিনিসপত্রের দামও কমতো।
হিলি স্থল শুল্ক স্টেশন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সদ্য সমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হিলি স্থলবন্দরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬২৭ কোটি ১২ লাখ টাকা নির্ধারণ করে দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)। সে হিসাবে অর্থবছরের প্রথম জুলাই মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। বিপরীতে এসেছে ৩১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। আগস্ট মাসে ৪৭ কোটি এক লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এসেছে ৪৩ কোটি ৯২ লাখ টাকা। সেপ্টেম্বর মাসে ৫৭ কোটি ৪২ লাখ টাকার বিপরীতে এসেছে ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অক্টোবর মাসে ৬৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিপরীতে এসেছে ৩৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা। নভেম্বর মাসে ৫৮ কোটি ছয় লাখ টাকার বিপরীতে আয় হয়েছে ৫২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। ডিসেম্বর মাসে ৫৩ কোটি ছয় লাখ টাকার বিপরীতে আয় হয়েছে ৫৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
জানুয়ারি মাসে ৪৮ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৪২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ফেব্রুয়ারি মাসে ৪৬ কোটি ২৮ লাখ টাকার বিপরীতে আহরণ হয়েছে ৩৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা। মার্চ মাসে ৬১ কোটি চার লাখ টাকার বিপরীতে আহরণ হয়েছে ১০৫ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এপ্রিল মাসে ৬২ কোটি ৮৭ লাখ টাকার বিপরীতে আয় হয়েছে ৫৬ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। মে মাসে ৩৭ কোটি পাঁচ লাখ টাকার বিপরীতে আয় হয়েছে ৯৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। জুন মাসে ৫০ কোটি ৬৭ লাখ টাকার বিপরীতে আয় হয়েছে ৪২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে পুরো অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৬৪১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এতে গত অর্থবছরের চেয়ে ১৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বেশি রাজস্ব আয় হয়েছে। এর আগের অর্থবছরে ৬০৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছিল ৪২৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৮১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা কম।
২০২২-২৩ অর্থবছরে বন্দর দিয়ে ১২ লাখ ৯৬ হাজার ৮৮৩ মেট্রিক টন বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছয় লাখ ২৬ হাজার ৪৯ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছে। হিসাবে আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে পণ্য আমদানি অর্ধেকে নেমেছে।
পণ্য আমদানি অর্ধেকে নামলেও রাজস্ব আয়ে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে বিভিন্ন পণ্যে অতিরিক্ত শুল্কায়নের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক শাহিনুর রেজা শাহিন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘গত অর্থবছরের তুলনায় সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে পণ্য আমদানি অর্ধেকে নেমে গেছে। যা কারও জন্য সুখকর নয়। কারণ বিভিন্ন পণ্যে অতিরিক্ত শুল্কায়নের কারণে রাজস্ব আয় বাড়লেও জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। যা আমদানিকারক ও সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি ফেলেছে।’
শাহিনুর রেজা শাহিন বলেন, ‘আগে এক টন জিরা আমদানিতে শুল্ক দিতে হতো এক লাখ ২০ হাজার টাকা। বর্তমানে দিতে হচ্ছে দুই লাখ ২৮ হাজার টাকা। ফলে বাজারে দ্বিগুণ হয়েছে দাম। একইভাবে সব পণ্যের শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়ায় আমদানি কমেছে জিনিসপত্রের। এ ছাড়া আমদানি-রফতানিতে আরও কিছু জটিলতা আছে। সেগুলো নিরসন করতে হবে। শুধু রাজস্ব আয় বাড়লেই তো হবে না; পণ্য আমদানি বাড়াতে হবে। না হয়, বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমবে না। অন্যান্য স্থলবন্দর দিয়ে মোটরসাইকেলের পার্টস আমদানিতে কেজি হিসেবে শুল্ক নেওয়া হলেও হিলি দিয়ে পিস হিসেবে নেওয়া হয়। এতে আগে বন্দর দিয়ে প্রচুর পরিমাণ মোটরসাইকেল পার্টস আমদানি হলেও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ফল আমদানির ক্ষেত্রে গাড়ির চাকা অনুযায়ী শুল্কায়নের প্রথা চালু আছে। যেমন ছয় চাকার একটি ট্রাকে যে পরিমাণ পণ্য আমদানিই হোক, শুল্ক দিতে হবে ১৪ টনের। তেমনি ১০ চাকার ট্রাকে ১৮ টন ও ১২ চাকার ট্রাকে যেই পরিমাণ পণ্য আমদানি হোক না কেন, শুল্ক পরিশোধ করতে হবে ২০ টনের। এতে দামে পড়তা না পড়ায় ফল আমদানিও বন্ধ আছে। অতিরিক্ত শুল্কায়নের কারণে আমদানিকারকদের লোকসান হওয়ায় অনেকে পণ্য আমদানি করছেন না। এসব জটিলতা নিরসন হলে পণ্যের আমদানি যেমন বাড়বে তেমনি রাজস্ব আয়ও আরও বাড়বে।’
হিলি স্থলবন্দর আমদানি-রফতানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন উর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আগে প্রতিদিন ২০০-২৫০ ট্রাকে বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি-রফতানি হতো। গত এক বছর ধরে আমদানি-রফতানি কমেছে। এর মূল কারণ ডলার সংকট ও অতিরিক্ত শুল্কায়ন। ব্যাংকগুলো আমাদের চাহিদা মতো পণ্যের এলসি খুলতে দিচ্ছে না। আগে প্রতিদিন শুধু পেঁয়াজ আসতো ৫০-৬০ ট্রাক। কিন্তু ভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানির ওপর ৪০ ভাগ শুল্ক আরোপ করেছে। ফলে দেশের বাজারে চাহিদা থাকলেও এত পরিমাণ শুল্ক দিয়ে এনে লাভ না হওয়ায় আগের মতো আমদানি করছেন না ব্যবসায়ীরা। একই কারণে খৈল, ভুসি ও ভুট্টা আমদানি কমেছে। আগে ১০০ ট্রাকের ওপরে বিভিন্ন ধরনের পাথর আমদানি হতো। বর্তমানে আমদানি হয় না বললেই চলে। বাড়তি শুল্কায়ন এর জন্য দায়ী। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি, আমদানি-রফতানি বাণিজ্য যাতে স্বাভাবিক থাকে।’
হিলি স্থল শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ লাখ ৯৬ হাজার ৮৮৩ মেট্রিক টন বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হয়েছিল। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে ছয় লাখ ২৬ হাজার ৪৯ মেট্রিক টন আমদানি হয়েছে। যা গত অর্থবছরের তুলনায় অর্ধেক। এরপরও লক্ষ্যমাত্রার বেশি রাজস্ব আয় হয়েছে। এর মূল কারণ অধিক শুল্কযুক্ত পণ্য বিশেষ করে জিরা আমদানি বেড়েছে। জিরার শুল্কায়ন মূল্য আগে ছিল টনপ্রতি এক হাজার ৮০০ ডলার। সেটি বাড়িয়ে তিন হাজার ৫০০ ডলার করা হয়েছে। বর্তমানে বন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি বানিজ্য স্বাভাবিক আছে। অধিক শুল্কযুক্ত পণ্য আমদানি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি।’