পতিত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি পর্যালোচনা নিয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। মঙ্গলবার জমা দেওয়া এ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতা এবং কিছু আমলা নিজেদের লাভের জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে বিশেষ আইনের আওতায় ফেলে ব্যাপক সুবিধা দিয়েছে। এতে করে সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করেছে। এছাড়া আদানির চুক্তিকে দেশবিরোধী আখ্যা দিয়ে এ ব্যাপারে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ করেছে জাতীয় কমিটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এদিকে বিতর্কিত আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন চুক্তির ব্যাপারে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সরকার গতকাল প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেনি এবং সহসা প্রকাশ নাও করতে পারে, নীতিনির্ধারক মহল থেকে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার দুপুরে রেল ভবনে পর্যালোচনা কমিটির আহ্বায়ক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে কমিটির অন্য সদস্যরা বিদ্যুৎ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এই প্রতিবেদন জমা দেন। উপদেষ্টাকে জমা দেওয়ার পর প্রতিবেদনটির ব্যাপারে জানতে চাইলে বিচারপতি মইনুল কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, প্রতিবেদনটি এখন সরকারের কাছে। তারা এ ব্যাপারে পরে জানাবেন। কমিটির আরেক সদস্য সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকও কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি যুগান্তরকে বলেন, কমিটির দায়িত্ব শেষ হয়েছে। তারা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে দিয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রতিবেদনের ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না। এটা পড়ে এবং বিশ্লেষণ করে পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এটি কখন প্রকাশ করা হবে এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আগে পড়ে দেখি তারপর সিদ্ধান্ত নেব।’
এর আগে গত ২ নভেম্বর জাতীয় কমিটি বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি নিয়ে প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেয়। ওইদিন কমিটির সদস্যরা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসানোর চুক্তি করে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এভাবে বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি খাতের বিশেষ আইন ব্যাপকভাবে অপব্যবহার করা হয়েছে। ওই চক্র বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে পিডিবিকে চুক্তি করতে বাধ্য করেছে। কমিটির একজন সদস্য জানান, কমিটি আদানি, বিশেষ আইনে ৫০টির মতো আইপিপির চুক্তি এবং ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করে দুর্নীতির ব্যাপক তথ্য পেয়েছে।
প্রসঙ্গত, পতিত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে বিদ্যুৎ খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি পর্যালোচনা করতে জাতীয় কমিটি গঠন করা হয় ২০২৪ সালের শেষদিকে।
সূত্র জানায়, কমিটি আদানির চুক্তি নিয়ে সবচেয়ে বেশি পর্যালোচনা করেছে। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন রাষ্ট্রবিরোধী চুক্তি আগে কখনো হয়নি বলে মনে করে জাতীয় কমিটি। কমিটি মনে করে, বিদ্যুতের দাম নিয়ে দারুণভাবে ঠকাচ্ছে আদানি। কমিটি আদানির চুক্তির পুরো ফাইল জব্দ করে পর্যালোচনা করেছে। সেখানে দেখা গেছে, সাবেক সচিব আহমেদ কায়কাউস কোনো আইন ও বিধি না মেনে আদানিকে ভারতের ঝাড়খণ্ডে তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র বসাতে অনুমোদন দিয়েছেন, যা আইনের লঙ্ঘন। এছাড়া আদানির সঙ্গে পিডিবির সম্পাদিত পিপিএ (বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি) পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সেখানে গুরুতর বেশকিছু অনিয়ম হয়েছে। আদানি এমন সব কঠিন শর্ত দিয়েছে যা অন্য কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যাপারে দেওয়া হয়নি। আদানির চুক্তিতে বলা হয়েছে, সরকার তাদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ না নিলেও ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে। এর বাইরে বিদ্যুৎ না নিলেও ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিল দিতে হবে। এমনকি বিল বকেয়া থাকলে ১ দশমিক ৫ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে।
এ অবস্থায় সরকার আদানির বিদ্যুৎ কেনা বন্ধ করবে কিনা সে ব্যাপারে কোনো সুপারিশ করতে পারেনি জাতীয় কমিটি। কমিটির সদস্যদের এক অংশ জানিয়েছে, এটি আন্তর্জাতিক চুক্তি। বাতিল বা বিদ্যুৎ নেওয়া বন্ধ করা খুবই কঠিন। অন্য একটি পক্ষ জানিয়েছে, তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে সমঝোতা করা দরকার। এদিকে জাতীয় কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী ৩ সপ্তাহ ধরে পিডিবিকে আদানির বিকল্প হিসাবে অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো যায় কিনা তা খতিয়ে দেখতে বলেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
পিডিবি সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত অনেকটা ভারতনির্ভর হয়ে পড়েছে। কারণ আদানির ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ছাড়াও ভারতের অন্যান্য কোম্পানি থেকে আমদানি করা হয় ১২০০ মেগাওয়াট। ফলে ভারত সরকার এই ২৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশ বড় ধরনের সংকটে পড়ে যাবে। মূলত বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ও জিম্মি করতেই ভারত হাসিনা সরকারের গোপন সমর্থন নিয়েই এমন ক্ষতি করেছে। তবে শেষমেশ এই বিদ্যুৎ সরবরাহ যদি ভারত বন্ধ করে দেয়, সেটি হবে ভূরাজনৈতিক কারণে। ফলে এই মুহূর্তে ভারতীয় বিদ্যুৎ বন্ধ করা সহজ নয়।
এদিকে জাতীয় কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনও সরকার রহস্যজনকভাবে গোপন রেখেছে। সেটি উপদেষ্টা বা সচিবের লকারে রাখা হয়েছে বলে সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিটির একজন সদস্য বলেন, সরকারের উচিত যত দ্রুত সম্ভব প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা; তা না হলে জনগণ অন্তর্বর্তী সরকারকেও সন্দেহ করবে।