অপহরণের পর ধর্মান্তর এবং বিয়েতে বাধ্য হওয়া লাকিংমে চাকমার লাশ নিয়েও টানাটানি শুরু হয়েছে। সপ্তম শ্রেণি পড়ূয়া এই মেয়েটি মা-বাবার সঙ্গে থাকত কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শিলখালী চাকমাপাড়ায়। স্থানীয় শামলাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ত সে। চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় টেকনাফের আতাউল্যাহসহ এক দল যুবক।
ঘটনার দিন লাকিংমের বাবা লালা অং চাকমা সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন। মেয়ে অপহরণের খবরে ছুটে আসেন তিনি। মামলা করতে যান টেকনাফ থানায়। পুলিশ মামলা নিতে রাজি না হওয়ায় ১৭ জানুয়ারি কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। তারপর কেটে গেছে প্রায় ১১ মাস। এ সময় মেয়েকে হন্যে হয়ে খুঁজেছেন বাবা। অবশেষে গত ৯ ডিসেম্বর মেয়ে লাকিংমে চাকমার খোঁজ পান। তবে জীবিত নয়, কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পড়ে আছে তার প্রিয় কন্যার নিথর দেহ। বলা হচ্ছে, লাকিংমে বিষপানে আত্মহত্যা করেছে।
অসহায় বাবা মেয়ের লাশ নিতে গিয়েও পড়েছেন বিপত্তিতে। অপহরণ, নাবালিকা বিয়ে এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরে বাধ্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত আতাউল্যাহ বাদ সাধলেন। নিজেকে লাকিংমে চাকমার স্বামী দাবি করে লাশ নেওয়ার আবেদন করেন তিনি। ফলে এই আবেদন গড়িয়েছে আদালতে এবং আট দিন ধরে লাকিংমের মরদেহ পড়ে আছে মর্গে। সেই পটভূমিতে তদন্ত সাপেক্ষে মৃতের ‘ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত’ হয়ে র্যাবকে মরদেহ সৎকার করার নির্দেশ দিয়েছেন কক্সবাজারের একটি আদালত।
চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি লাকিংমে অপহরণের দিন বাড়িতে ছিলেন না তার বাবা লালা অং চাকমা। গতকাল সমকালের সঙ্গে আলাপে তিনি জানান, বাড়ি ফিরে জানতে পারেন, তার মেয়েকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়রা ধাওয়া করেছিলেন। তখনই তিনি জানতে পারেন আতাউল্যাহ, ইয়াসিন, ইসা, আবুইয়াসহ আরও চার-পাঁচজন অপহরণে জড়িত। জন্মসনদ অনুসারে অপহরণের দিন মেয়ের বয়স ছিল ১৪ বছর ১০ মাস। ওই দিনই ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মো. হাফেজকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। ইউপি সদস্য কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় পরে মামলা করতে যান থানায়। তখন টেকনাফ থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন প্রদীপ কুমার দাশ। তিনি মামলা নিতে রাজি না হওয়ায় ২৭ জানুয়ারি কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মেয়েকে উদ্ধারের জন্য মামলা করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে কক্সবাজার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের দায়িত্ব দেন।
পিবিআই গত ৯ আগস্ট কক্সবাজার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, লাকিংমে চাকমাকে অপহরণ করার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। অথচ অন্তত পাঁচজন সাক্ষী জবানবন্দিতে বলেছিলেন, লাকিংমেকে তার বাড়ি থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই কক্সবাজার ইউনিটের পরিদর্শক (নিরস্ত্র) ক্যশৈনু মারমা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এজাহারে যে পাঁচজনকে সাক্ষী রাখা হয়েছে, তারা লাকিংমে চাকমার আত্মীয়। আমি এসব সাক্ষী ছাড়াও প্রত্যক্ষদর্শী এবং এলাকার বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। এই পাঁচ সাক্ষী ছাড়া এলাকার আর কেউ অপহরণের কথা বলেনি। ফলে আমি তদন্ত প্রতিবেদনে লাকিংমে চাকমা নিজেই চলে গেছে বলে উল্লেখ করেছি।
তদন্ত প্রতিবেদনের বক্তব্যের ব্যাপারে লাকিংমের বাবা লালা অং চাকমা বলেন, ‘সেদিন যদি সঠিক প্রতিবেদন দেওয়া হতো, তাহলে মেয়ের এমন করুণ মৃত্যু দেখতে হতো না। আমার মেয়েকে জোর করে তুলে নিয়ে গেল, ধর্মান্তরিত করল; নাবালিকা মেয়েকে বিয়ে করল এবং অত্যাচার করে মেরে ফেলল! জীবিত মেয়েকে ঘরে ফিরিয়ে দিতে পারেননি; অন্তত মৃত মেয়েকে ফেরত দেন। লাশটি বুকে জড়িয়ে নিয়ে সম্মানের সঙ্গে সৎকার করি।’
কক্সবাজার সদর থানার উপপরিদর্শক আব্দুল হালিম বলেন, আতাউল্যাহ নামে একজন দাবি করেন, তার স্ত্রী লাকিংমে বৃহস্পতিবার সকালে বিষ খেয়েছে। লাকিংমের আত্মীয় অং ক্য হদ্মা বলেন, বৃহস্পতিবার অভিযুক্ত আতাউল্যাহ থানা হাজতে ছিলেন। পরে পুলিশ আতাউল্যাহকে ছেড়ে দেয়।
অভিযুক্ত আতাউল্যাহর বক্তব্য জানতে গতকাল সন্ধ্যা থেকে রাত পৌনে ৮টা পর্যন্ত মোবাইল ফোনে চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। এরপর রাত সাড়ে ৮টায় আতাউল্যাহর বড় ভাই মনির উদ্দিনকে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘আমার ছোট ভাই এখন বাড়িতে আছে। তার মানসিক অবস্থা ভালো নয়। সে কথা বলতে পারবে না।’ তবে ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘লাকিংমে চাকমার বর্তমান নাম হালিমাতুল সাদিয়া। ওই সময়ে তাকে জোর করে আমার ভাই নিয়ে গিয়েছিল কিনা, তা জানি না। আতাউল্যাহ ওই মেয়েটিকে নিয়ে তার কর্মস্থল কুমিল্লায় চলে গিয়েছিল। ছয় মাস আগে স্ত্রীকে নিয়ে আতাউল্যাহ টেকনাফের বাড়িতে আসে। গত ৯ ডিসেম্বর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে আতাউল্যাহ তার স্ত্রীকে থাপ্পড় দেয়। এরপর রুমে ঢুকে সাদিয়া (লাকিংমে) বিষ পান করে।’
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম কক্সবাজার আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক মংথেন হদ্মা রাখাইন গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে সমকালকে বলেন, লাকিংমে চাকমার বাবা যেন লাশ ফিরে পান সে জন্য জন্মসনদসহ আদালতে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু আসামিপক্ষ স্থানীয় চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করে আরেকটি জন্মসনদ আদালতে জমা দিয়েছে। সেখানে তার বয়স ১৮ বছরের ওপরে লেখা হয়েছে। এই সনদ ভুয়া। কারণ লাকিংমে চাকমা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত। আজকালের মধ্যে লাশের একটা সুরাহা হয়তো মিলবে। তবে ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা উচিত।
#সমকাল