বুয়েটিয়ানদের মূলত চার লাখ পিপিই বানানোর উদ্যোগ আর ক্রেডিট অন্যের

চার লাখ পিস পিপিই বানানোর উদ্যোগটা মূলত বুয়েটিয়ানদের। কিন্তু এই পোড়ার দেশে যেটা সবচেয়ে বেশি চুরি হয় সেটা হলো অন্যের ক্রেডিট। কারণ, সবাই শর্টকাটে তাড়াতাড়ি বড়লোক আর জনপ্রিয় হইতে চায়।

স্বপ্না ভৌমিকও সেই কাজটাই করেছেন। একদল উদ্যমী মানুষের পরিশ্রমকে ক্রেডিট না দিয়ে নিজে তারকা হতে চেয়েছেন। সেই আকাঙ্খা থেকে ফেসবুকে পোস্ট এবং তার জেরে রাতারাতি ভাইরাল।

আর সাংবাদিকরা কোনোরকম সত্য়াসত্য় যাচাই না করেই একটি ফেসবুক পোস্টকে নিউজ করে ছড়িয়ে দিয়েছেন, যেটা তারা প্রায়ই করেন।

ফলে এরকম একটি শুভ উদ্যোগের পেছনের মানুষগুলো বিহাইন্ড দ্য় সিনেই থেকে গেছেন।

হ্যাঁ, স্বপ্না ভৌমিকও প্রশংসার দাবিদার। কারণ তার প্রতিষ্ঠান পিপিই বানাতে এগিয়ে এসেছে। কিন্তু সেটা তো হবে পয়সার বিনিময়েই। উদ্যোক্তাদের কথা চেপে গিয়ে উনি নিজে ক্রেডিট নিতে চেয়েছেন, যেটা অন্যায়।

আমার বুয়েটিয়ান বন্ধু Ahmed Javed Jamal সেই উদ্যোক্তাদের একজন, যারা এই দুঃসময়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সংকল্প করেছে।

পিপিই নিয়ে ঘোলাজল পরিষ্কার হবে তার লেখাটি পড়লেই।

#করোনা নিয়ে ব্যবসা নয়

যারা ফ্রেন্ডলিস্টে আছেন এবং বুয়েটের গ্রুপে আছেন, তারা জানেন বুয়েটের অনেক অনেক ডেডিকেটেড মানুষজন দেশের এই দুর্যোগময় মুহূর্তে কিভাবে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে যাচ্ছেন।

বুয়েটের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানানোর পর (এই উদ্যোগের পেছনে ‘বুয়েট ৮৬ ব্যাচ’ আর ‘মানুষ মানুষের জন্য’ ফাউন্ডেশন এর অবদান সবচাইতে বেশি, তারাই উৎসাহিত করেছে এবং ফান্ডিং এর ব্যবস্থা করেছে) সেই হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিনামূল্যে হাসপাতাল আর ক্লিনিকগুলোতে বিতরণ করা হয়েছে। এই খবর যদিও জাতীয় মাধ্যমে এসেছে অনেক পরে। হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানানো এখনো চলছে এবং বুয়েটের একদল স্বেচ্ছাসেবী রয়েছেন যারা হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানানোর কাজ করে যাচ্ছেন।

হ্যান্ড স্যানিটাইজার বানানোর পাশাপাশি বুয়েটিয়ানরা চিকিৎসকদের মেডিকেল পিপিই (আপনারা জানেন হয়তো করোনা আক্রান্ত অবস্থায় কি ধরনের পিপিই চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সেবায় যারা জড়িত, তারা ব্যবহার করে) স্থানীয়ভাবে তৈরির পরিকল্পনা করে। কারণ-এই মুহূর্তে ইম্পোর্ট করতে গেলেও মিনিমাম ১৫/২০ দিন চলে যাবে আর এত দীর্ঘ সময় মানে একটা ম্যাসাকার হয়ে যেতে পারে। সেই ধারাবাহিকতায় বুয়েটিয়ান ফজলে মাহবুব অভি এবং ইকবাল তানজির এই দুজন মেডিকেল স্যুট আর মাস্কের ফেব্রিক স্থানীয় মার্কেটে, ফ্যাক্টরিতে খোঁজা শুরু করেন (এর আগে অভি অবশ্য ডিস্পোজেবল এপ্রোন তৈরি করেছিল নিজ উদ্যোগে, সেই খবর বুয়েটিয়ানদের গ্রুপে দেয়ার পর সবাই মেডিকেল স্যুট বানানোর কাজটাকেই প্রায়োরিটি দেয়)।

সেই প্রেক্ষিতে এই শুক্রবার অভি এবং ইকবাল মার্ক্স এন্ড স্পেন্সারের অফিসে যায় এবং সেখানে উনাদের বলেন বুয়েটিয়ানদের উদ্যোগের কথা এবং ফেব্রিকের ব্যাপারে সাহায্য চান। যেহেতু মার্ক্স এন্ড স্পেন্সার গার্মেন্টস প্রোডাক্ট নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করে সেহেতু তাদের পক্ষে ফেব্রিক সোর্সিং করিয়ে দেয়াটা সহজ সাধ্য কাজ। উল্লেখ্য এখানে অভি এবং ইকবাল কেউই আগে ফেব্রিক নিয়ে কাজ করেননি, গত তিন/চারদিনের দৌড়ঝাঁপ আর মেডিকেল পিপিই নিয়ে আলোচনা আর পড়াশোনায় উনারা বুঝতে পেরেছিলেন কোন ফেব্রিক দিয়ে কাজ হবে। সেই কাজের ধারায় গতকাল তারা ধামরাইয়ের একটা ফ্যাক্টরিতে যায় এবং সেখানে নন ওভেন ফেব্রিক, জিএসএম-৬০পায় (অভি এবং ইকবালের কাছে ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রধানের কাছ থেকে সংগ্রহ করা মেডিকেল স্যুট ছিল, যেই স্যুট ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রধান অভিকে শুক্রবার স্যাম্পল হিসেবে দিয়েছিলেন)। তো, ফেব্রিক দেখে অভি-ইকবাল, ফ্যাক্টরির কিউসি, মার্ক্স এন্ড স্পেন্সারের প্রতিনিধি সবাই একমত হলেন যে এই ফেব্রিকে কাজ হবে। এরপর স্যাম্পল বানানো হলো, সেই স্যাম্পল নিয়ে ধামরাই থেকে সন্ধ্যায় ফিরে উনারা সবাই সিএমএসডির প্রধানকে দেখালেন, উনি স্যাম্পল আর ডিএমসির সরকার প্রদত্ত মেডিকেল স্যুট দেখলেন এবং উনি স্যাম্পল অ্যাপ্রুভ করলেন তার মানে স্থানীয়ভাবে মেডিকেল স্যুট বানানো যাবে। এটা বিশাল এক অর্জন বলা যায়। এরপর অভি-ইকবালসহ বুয়েটিয়ানরা যার যার নেটওয়ার্ক এ যারা আছেন, সবাইকে বিষয়টা জানান বিশেষ করে অভি বেশকিছু কর্পোরেট হাউজে ফোন দিতেই উনারা ডোনেশন দিতে রাজি হন। এরপর সবাই চার লাখ পিসের টার্গেট নেন যাতে করোনা নিয়ে যেসব মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, চিকিৎসক যারাই লাজ করছেন না কেন সবাই যেন এই মেডিকেল স্যুট, মাস্ক পায়, সাথে লাগবে গ্লাভস আর গগলস। গ্লাভস আর গগলস কাপড়ের হলে কাজ হবে না, এগুলা লাগবে ল্যাটেক্স/রাবারের।

এসব কাজই ছিল গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত আনন্দের। কিন্তু এরপরই শুরু হয় পুরো বিষয় নিয়ে ব্যবসা! মার্ক এন্ড স্পেন্সারের স্বপ্না ভৌমিক প্রথমে নিজে পোস্ট দেন, পরে অন্য আরেকজন পোস্ট দেন।

সেই পোস্টগুলোর ভাষ্যমতে, “এই এপ্রোনের চিন্তা ছিল স্বপ্না ভৌমিকের, উনি বুয়েটের এলামনাইদের কাছ থেকে ডিজাইন নিয়ে সমস্ত পিপিই বানিয়ে ফেলছেন, চার লাখ পিস পিপিই স্বপ্না বানাচ্ছেন, উনার ২১ দিন আগে মা মারা গেছেন, মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছেন (পোস্টদাতা লাইক কামানোর জন্য মৃত মা সংযুক্ত করেছেন)”

এবার আসা যাক সত্যাসত্য যাচাইয়ের ব্যাপারটা।

যারা গার্মেন্টস টেক্সটাইল জগতে আছেন, তারা জানেন বায়িং হাউজ গুলোর লিমিটেশন এর কথা। এর মধ্যে করোনা ভাইরাসের কারণে প্রায় সমস্ত বায়িং হাউজ বাংলাদেশে তাদের সমস্ত অর্ডার ক্যানসেল করে ফ্যাক্টরিগুলোকে বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছে আর মার্ক্স এন্ড স্পেন্সারের হেড কোয়ার্টার ইউরোপ হওয়ায় এরা আরো বেশি সেনসিটিভ। আর বায়িং হাউজগুলো চাইলেই একদিনের মধ্যে দাতব্য কাজে আসতে পারে না, আজ পর্যন্ত কোন বায়িং এরকম দাতব্য কাজে এগিয়ে আসেনি। তাহলে চার লাখ পিস কি স্বপ্না ভৌমিক নিজের টাকায় বানাবেন? সেই এখতিয়ারও কিন্তু তার নাই বায়িং হাউজের নাম করে চ্যারিটিতে এভাবে আসার। আর উনি যদি বানানোর স্বপ্নই দেখে থাকেন তাহলে গতকালই ক্যান স্বপ্ন পূরণ হলো? আপনারা জানেন বায়িং হাউজে ফ্যাশন ডিজাইনারের অভাব নাই, তাছাড়া ইন্টারনেট এর ডাউনলোড অপশন ব্যবহার করে অথবা মার্ক্স এন্ড স্পেন্সারের হেড অফিস থেকেই অত্যাধুনিক মেডিকেল স্যুট এই মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকেই বানাতে পারতেন, বানাননি ক্যান??? ক্যান বানাননি?

এখন আসি চার লাখ পিসের কথায়, ধরুন একটা মেডিকেল স্যুটের খরচ ২০০/-কমপক্ষে, চার লাখ পিসের দাম কত? এত টাকা দিবে মার্ক্স এন্ড স্পেন্সার? দিয়েছে কখনো?

এখন আসুন আসল কথায়: চার লাখ পিসের যেই টার্গেট করা হয়েছে সেখানে যেসব কর্পোরেট হাউজ এগিয়ে আসতে চাইছে তার মধ্যে একটা বিএসআরএম, আচ্ছা বিএসআরএম কি ফেব্রিকের কাজ করে? যদি কাজ না করে তাহলে মার্ক্স এন্ড স্পেন্সারের সাথে কোন লিয়াজো থাকবে? না থাকারই সম্ভাবনা। সেইম ফর আকিজ গ্রুপ, জিপি ইত্যাদি।

আসলে পুরো মিথ্যা একটা ব্যাপার যেভাবে ভাইরাল হলো সেটা নিতান্তই দুঃখজনক, উনি একটা ফেব্রিক রিলেটেড বায়িং এ দায়িত্বশীল পদে থেকে একটা চ্যারিটি কাজকে নিজের নামে চালাবেন এটা ভাবা যায় না।

আর কারা ফান্ডিং এর জন্যে এগিয়ে এসেছে?
১)কর্পোরেট হাউজগুলো-এদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে বুয়েটিয়ানদের মাধ্যমে,
২)মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ফাউন্ডার হলেন বুয়েটিয়ান,এই ফাউন্ডেশন এর সাথে বহু বাংলাদেশি জড়িত আছেন।
৩)চিকিৎসক গণ
৪)দেশে এবং প্রবাসে থাকা বুয়েটিয়ানরা এবং বাংলাদেশিরা।

যাহোক, চার লাখ পিস আমরা বানাবোই ইনশাআল্লাহ, তবে মিথ্যাচার কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থান্বেষী মহলকে সাথে নিয়ে না।

ইতোমধ্যে বিকেএমইএ আমাদের বলেছে উনারা ফ্রি অব কস্টে এপ্রোন, মাস্ক বানিয়ে দিবেন।

দুর্যোগে দেশ আপনাকে চায়।

ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Next Post

বিরল ঘটনা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে !(ভিডিও)

Share on Facebook Tweet it Pin it বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। যেখানে পর্যটনের ভরা মৌসুমে লাখো পর্যটকের উপস্থিতিতে মুখরিত থাকে সৈকতের এই শহর। কিন্তু করোনা ভাইরাসের আতঙ্কে পুরো সৈকতজুড়ে এখন সুনশান নীরবতা। নেই পর্যটকের আনাগোনা, ফটোগ্রাফার, বিচ বাইক চালক, জেড স্ক্রী চালক কিংবা হকারদের। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকাল থেকে […]

Visit Sristy Barta Facebook Page

https://www.facebook.com/sristybarta/
error: সৃষ্টি বার্তা থেকে কপি করা যাবে না।