এবার সরকারি খরচে হজে যাওয়ার জন্য এ পর্যন্ত ২৭৯ জনের নাম চূড়ান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক ও গাড়ি চালক থেকে নানা পদমর্যাদার কর্মকর্তারাও রয়েছেন। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছে ঢাকা ট্রিবিউনের কন্টেন্ট পার্টনার ডয়চে ভেলে। এ সময় তারা তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে না পারলেও “হাজি সাহেবদের সেবা” করতে যাচ্ছেন- এমন একটি সাধারণ উত্তর পাওয়া গেছে।
এরই মধ্যে তাদের তালিকা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের হিসাব রক্ষণ ও অর্থ কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে। সেই তালিকা সংগ্রহ করেছে ডয়চে ভেলেও। ২৭৯ জনকে প্রধানত চারটি ক্যাটাগরিতে নির্বাচন করা হয়েছে। ক্যাটাগরিগুলো হলো- মেডিকেল টিম, প্রশাসনিক সহায়তাকারী দল এবং কারিগরি সহায়তাকারী দল এক ও দুই।
চিকিৎসক দলে আছেন ১৩৮ জন, প্রশাসনিক সহায়তাকারী দলে ৯৯ জন এবং দুইটি কারিগরি সহায়তাকারী দলে ৪২ জন। তাদের প্রত্যেকের জন্য গড়ে সাত লাখ টাকা করে খরচ হবে। তবে তাদের যাওয়ার আগে প্রত্যেককে দুই লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। বাকি টাকা আগামী অর্থ বছরে চূড়ান্ত বিল জমা দেওয়া সাপেক্ষে পরিশোধ করা হবে। মোট ২০ কোটি টাকার মতো খরচ হবে সরকারের এই খাতে।
যারা যাচ্ছেন
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক থেকে সর্বোচ্চ পদমর্যাদার মোট কর্মকর্তা আছেন ১২০ জন। তাদের মধ্যে ৬১ জনই এবার হাজিদের সেবা করার জন্য হজে যাচ্ছেন। এছাড়া আছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, অর্থ মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংসদ সচিবালয়, সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পুলিশসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারী। তালিকায় গাড়ি চালক আছেন ১৫ জন, অফিস সহায়ক ও মুদ্রাক্ষরিক আছেন ১৫ জন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য আছেন ১৫ জন।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের একাধিক গাড়ি চালক, অফিস সহায়ক জনসংযোগ কর্মকর্তা, প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তাসহ একটি মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারি খরচে হজে যাচ্ছেন।
গিয়ে যা করবেন
মনিরুল ইসলাম ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা। তার মোবাইল ফোনের লাইনটি ভালোই ছিল। বুধবার প্রতিবেদকের সঙ্গে কথাও শুরু করেন, কিন্তু যখন জানতে চাওয়া হয় তিনি কী কাজে হজে যাচ্ছেন তখন তিনি বলেন, “ভাই আপনার কথা শুনতে পাচ্ছি না। পরে কথা বলবো।”
এরপর লাইন কেটে দেন। তাকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি। তার নাম রয়েছে প্রশাসনিক সহায়তাকারী দলে।
প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব মো. মামুনুল করিম যাচ্ছেন কারিগরি টিমের সদস্য হিসেবে। কেন যাচ্ছেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যারা হজে যাবেন, তারা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাদের সহায়তার জন্য যাচ্ছি। তারা যে সমস্যায় পড়বে, সেই সমস্যারই সমাধানের চেষ্টা করবো।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হায়দার আলিও আছেন কারিগরি টিমে। তিনি বলেন, “আমার কাজ কী হবে তা এখনো জানি না। গত পরশুদিন ব্রিফিং হয়েছে। অন্য একটি কাজ থাকায় আমি ব্রিফিংয়ে থাকতে পারিনি। পরে জেনে নেবো। তবে মূল কাজ হবে হাজিদের সেবা করা। আর আগে আমি ব্যক্তিগতভাবে গিয়েছি৷। তবে হাজিদের সেবায় এবারই প্রথম যাচ্ছি।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. বেলাল হোসেন। তিনিও যাচ্ছেন মেডিকেল টিমের সদস্য হিসেবে। তার কথা, “হাজিদের চিকিৎসার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি হজ মিশন নিয়েছে। তারপরও আমরা যারা মেডিকেল টিমে আছি, তারা ওখানে গিয়ে হাজিদের চিকিৎসায় সহায়তা করবো।”
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিঝিল জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. নুরুল আমিনও হজে যাচ্ছেন কারিগরি টিমের সদস্য হিসেবে। তার কাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “হাজিদের সকল সেবা বা যে-কোনো ধরনের সহযোগিতার জন্য আমরা যাচ্ছি। আমরা মোট দুইজন যাচ্ছি। তবে এর বাইরে গানম্যান ও কনস্টেবলরাও যাচ্ছেন ভিআইপিদের সেবা দেওয়ার জন্য।”
হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর সভাপতি এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, “মিনা, আরাফা ও মুজদালেফা মিলিয়ে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা পাঁচ দিন। এই সময়ে পুরোটা সৌদি সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকে। তখন সৌদি কর্তৃপক্ষ ছাড়া আর কোনো পক্ষের সেখানে চিকিৎসাসহ কোনো ধরনের সেবা দেওয়ার সুযোগ নেই।”
তবে এর আগে-পরে প্রাথমিক চিকিৎসাসহ অন্য সেবা দেওয়ার সুযোগ আছে বলে তিনি জানান। বিশেষ করে বাংলাদেশ হজ মিশনের উদ্যোগে সেখানে যে ক্লিনিক তাতে বাংলাদেশি মেডিকেল টিমের দরকার আছে হজের সময়।
সংখ্যা আরও বাড়বে
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (হজ অণু বিভাগ) মো. মতিউল ইসলাম বলেন, “২৭৯ জনকে হাজিদের নানা ধরনের সেবা দেওয়ার জন্য পাঠানো হচ্ছে। তাদেরকে স্পষ্ট করেই বলে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের মূল কাজ হাজিদের সেবা করা। মূল কাজ হজ করা নয়।”
এত লোক হাজিদের কী সেবা দেবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আগে আরও বেশি গিয়েছে। এবার হাজি কম বলে কম পাঠানো হচ্ছে। তাদের কার কী কাজ তা নির্দিষ্ট করা আছে। যাদের প্রয়োজন, তাদেরই পাঠানো হচ্ছে। কোনো অতিরিক্ত লোক পাঠানো হচ্ছে না।”
তার কথা, হজ ব্যবস্থাপনা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কাজ। তাই এই মন্ত্রণালয় থেকে বেশি যাচ্ছে। আরেকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা সব মন্ত্রণালয়কেই খুশি রাখার চেষ্টা করি।”
এ বিষয়ে কথা বলতে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীকে বুধবার প্রথমে ফোনে পাওয়া গেলেও তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানান। তবে পরে আর তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
মতিউল ইসলাম জানান, সরকারি খরচে হজে যাওয়াদের সংখ্যা আরও বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে ৬০ জনের একটি তালিকা পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, “এরা অবশ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের না। সারাদেশ থেকে যারা তার কাছে আবেদন করেছেন, সেখান থেকে তিনি বাছাই করে পাঠিয়েছেন। তারা অসচ্ছল। তারা প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্যে হজে যাবেন।”
ধর্ম মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী মমিটির ১০ জন সদস্যের প্রত্যেকের সুপারিশে তিনজন করে আরও ৩০ জন সরকারি খরচে হজে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
এবার সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনা মিলিয়ে মোট ৫৩ হাজার ৫৮৫ জন হজে যাচ্ছেন। প্রথমে সরকারিভাবে হজে যেতে প্যাকেজ-১-এ পাঁচ লাখ ২৭ হাজার ৩৪০ টাকা এবং প্যাকেজ-২-এ চার লাখ ৬২ হাজার ১৫০ টাকা এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যেতে চার লাখ ৫৬ হাজার ৬৩০ টাকা খরচ নির্ধারণ করা হয়। পরে আরও ৫৯ হাজার টাকা বাড়ানো হয়।